প্রকাশ্যে চলছে চাঁদাবাজি! পরিবহন থেকে প্রতিদিন তোলা হচ্ছে দুই লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজশাহী মহানগরীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আদালতের সামনে থেকে প্রতিদিন শতাধিক হিউম্যান হলার ছেড়ে যায় পুঠিয়া পৌর এলাকা ও বানেশ^রের উদ্দেশ্যে। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সামনে থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের নামে গাড়িপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। একই অবস্থা বানেশ^র বাজারে। বানেশ^রের পুলিশ বক্সের সামনে থেকে হিউম্যান হলার এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা। রাজশাহী থেকে পুঠিয়া পর্যন্ত পাঁচটি জায়গায় দিতে হচ্ছে চাঁদা। পুলিশের নাকের ডগাতে চলছে এই চাঁদাবাজি। যেন দেখেও না দেখে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ বাস, ৫০০ সিএনজি ও শতাধিক হিউম্যান হলার থেকে গড়ে দুই লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। এর বাইরে নগরীতে চলাচলকৃত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকেও নেওয়া হচ্ছে চাঁদা। এই টাকা ভাগ যাচ্ছে বিভিন্ন স্তরে। প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি হলে নীরব যেন সবাই। সংগঠনগুলোর বাইরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যেও অনেকের নামে পরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।
গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ২৫ জন চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে। তবে নগরজুড়ে এখনো প্রকাশ্যে চলছে চাঁদাবাজি, আর সাধারণ চালকরা প্রতিদিনই পড়ছেন হয়রানির মুখে।
বানেশ্বর মোড়ে পুলিশের ট্রাফিক বক্সের সামনেই প্রকাশ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে ১০ থেকে ২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে রতন নামের এক যুবক। তিনি এই বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি। কার নির্দেশে বা কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে টাকা তোলা হচ্ছে তা তিনি বলতে চাননি।
এদিকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের হিউম্যান হলার স্ট্যান্ডে প্রতিদিন প্রায় গাড়ি থেকে মালিক সমিতির নামে ১০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। কোর্ট এলাকা থেকে বানেশ্বর পর্যন্ত চারটি পয়েন্টে দিতে হচ্ছে আরও ১২০ থেকে ১৫০ টাকা। শুধু তাই নয়, গ্রামাঞ্চলে তানোরের চান্দুরিয়া বাজারে টেবিল-চেয়ার পেতে বসে প্রতি বাস থেকে ৩০ টাকা করে চাঁদা নিচ্ছে নাজিম উদ্দিন। মুঠোফোনে ধারণ করা ফুটেজে ধরা পড়েছে এসব চিত্র।
হিউম্যান হলারের চালক নাজমুল হাসান বলেন, রাজশাহী থেকে পুঠিয়া পর্যন্ত প্রতিদিন আড়াইশো টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। আমাদের প্রতি ট্রিপে এক হাজার টাকাও হয় না। এরপর মালিক, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ আর আমাদের বেতন নিতে হয়। আড়াইশো টাকা নিয়ে নিলে তাহলে আমাদের হাতে থাকে কী? এসব কি প্রশাসনের নজরে পড়ে না? তাদের সামনেই তো প্রকাশ্যে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাজশাহী মহানগরীজুড়ে অন্তত ২০টি পয়েন্টে বাস, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, হিউম্যান হলার ও সিএনজি থেকে চাঁদা আদায় করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ভয়ে টাকা দিতে বাধ্য হলেও ক্ষোভে ফুঁসছেন চালকেরা।
রাজশাহী মহানগরীর রেলগেট এলাকায় সিএনজি থেকে চাঁদা তুলছে মেরাজ আলী নামে এক ব্যক্তি। শুধু তানোর রোডেই ১৪৪টি সিএনজি চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ি থেকেই নেওয়া হয় ২০ টাকা করে। এছাড়াও এখান থেকে বাগমারা উপজেলা, দুর্গাপুর উপজেলা, মান্দা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় পাঁচ শতাধিক সিএনজি ছেড়ে যায়। এসব সিএনজি থেকেও নেওয়া হচ্ছে টাকা। কোনো চালক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আটকে রাখা হচ্ছে তাদের গাড়ি।
তাহেরপুরের সিএনজি চালক জোনায়েদ হোসেন বলেন, তাহেরপুর-রাজশাহী প্রতিদিন দুইবার আপডাউন করতে হয়। রেলগেটে প্রতিবার ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। যা তোলা হচ্ছে মালিক সমিতির নামে। কিছু বললে গাড়ির চাবি কেড়ে রেখে দেওয়া হচ্ছে। ঠিকমতো গাড়ির ট্রিপও পাওয়া যায় না।
অভিযোগের বিষয়ে চাঁদা আদায়কারীরা স্বীকার করেছেন যে তারা টাকা নেন। তবে এভাবে চাঁদা তোলার বৈধতা সম্পর্কে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তারা অকপটে স্বীকার করেন, এই টাকার একটি অংশ মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের পকেটেও যাচ্ছে।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলেন, সংগঠনের ব্যয় নির্বাহেই চাঁদার টাকা খরচ হয়। বাসের মালিকদের সম্মতিতে এই টাকা নেওয়া হয়। এই টাকা দিয়ে বিভিন্ন অনুদান দেওয়া হয়। তবে কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়- সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
রাজশাহী মেট্রোপলিটনের উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান জানান, মালিক বা শ্রমিক ইউনিয়ন গাড়িপ্রতি নির্দিষ্ট টাকা নেয়। তবে এর বাইরে কেউ চেয়ার-টেবিল বসিয়ে চাঁদা নেয় বলে আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, দৃশ্যমান চাঁদাবাজি রোধ করা তুলনামূলক সহজ। তবে যারা পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ে, তাদের ধরতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। এরপরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে দ্রুতই চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করবে।