বিএনপির মনোনিত প্রার্থী নিয়ে অসন্তুষ্টি! আসনগুলোতে নেতাদের বাড়ছে দ্বন্দ্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩৭ আসনে প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগের ৩৪টি আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। ফাঁকা রাখা হয়েছে ৫টি আসন। ধারণা করা হচ্ছে এই পাঁচটি আসন ছাড়া হতে পারে বিএনপির সঙ্গে জোট করতে যাওয়া দলগুলোকে। তবে বিভাগের বেশকিছু আসনে বিএনপির প্রার্থী নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তুষ্টি দেখা গেছে। আবার পাঁচটি আসনে প্রার্থী না দেওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। এনিয়ে আসনগুলোতে বাড়ছে দ্বন্দ্ব।
বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করছেন, ঘরোয়া দ্বন্দ্বের রাশ টানতে না পারলে অনেক আসন হাতছাড়া হতে পারে। রাজশাহী বিভাগে জামায়াতের কিছু আসনে হেভিওয়েট প্রার্থীও আছে। তাদের কাছে ভরাডুবি হতে পারে। এ নিয়ে তৃণমূলে হতাশা আর ক্ষোভ ঝরছে। কর্মিরা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ-দুঃখে ফুঁসছেন। রাজশাহী বিভাগের কিছু আসনে প্রার্থিতা বদলের আন্দোলন চলছে। কোথাও সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
যদিও দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ তালিকা চূড়ান্ত নয়। দলের স্থায়ী কমিটি যদি মনে করে, পার্লামেন্টারি বোর্ডের কাছে প্রতীয়মান হয় তারা কোনো আসনে প্রার্থী বদল করবে, সেটি নিঃসন্দেহে নিয়ম মেনে পরিবর্তন আসবে।
বিতর্কিত ও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই-এমন অনেক প্রার্থীর নাম ঘোষণাকে কেন্দ্র করে প্রার্থী পুনর্বিবিবেচনার দাবি উঠেছে তৃণমূল থেকে। বিক্ষোভ, মশাল মিছিল, সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা। এ ছাড়া যেসব আসনে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি, সেগুলোর কিছু কিছুতে দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়নের দাবি জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।
রাজশাহী-৩ আসনে ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। এবারেও তিনি এই আসন থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। এই আসনটিতে তিনি রাজনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু তার মনোনয়ন নিয়ে বিরোধিতা করছেন ওপর দুই মনোনয়ন প্রত্যাশী। এরা হলেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রায়হানুল আলম রায়হানের সমর্থক এবং সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কবির হোসেনের ছেলে নাসির হোসেন অস্থির। তাদের অনুসারীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশও করেছেন। অনুসারীরা বলছেন, এ আসনে বহিরাগত কোনো প্রার্থী চাই না। স্থানীয় প্রার্থী দিয়ে এ আসনটিতে ভোট করতে হবে।
বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজশাহী-৪ আসনটিতে। ৩ নভেম্বর দলের মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই এ উপজেলায় রাজনৈতিক সহিংসতা শুরু হয়েছে। ককটেল হামলা এবং তিনটি পুকুরে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়া। বেশি প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন এ আসনের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক কামাল হোসেনের অনুসারীরা। মনোনয়ন ঘোষণার পর ওই রাতেই বাইগাছা গ্রামের এমরান আলী নামের এক ব্যক্তির সাড়ে ৬ শতক জায়গা দখলে নিতে প্রাচীর ভেঙে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়।
শনিবার দিবাগত রাতে দুবিলা মধ্য দৌলতপুর বিলে অধ্যাপক কামাল হোসেনের চাচা ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক উপাধ্যক্ষ আব্দুস সোবহানের ইজারা নেওয়া তিনটি পুকুরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। ৬০ বিঘার এই পুকুর তিনটিতে বিষ প্রয়োগের ফলে প্রায় ২ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে। এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জেলা যুবদলের সদস্যসচিব রেজাউল করিম টুটুলও। শনিবার রাতে টুটুল ও তার শ্বশুর আবদুস সামাদের বাড়িতে ককটেল হামলা করা হয়। টুটুলের বাড়িতে ফেলে রাখা ককটেলগুলো বিস্ফোরিত হয়নি। তবে তার শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুস সামাদের বাড়িতে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। পুলিশ আলামত উদ্ধার করেছে। টুটুলের বাড়ি বাগমারার বুজরুককৌড় গ্রামে। আর তার শ্বশুরবাড়ি শান্তিপাড়া গ্রামে।
রাজশাহী-৫ আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। রাজশাহী-৫ পুঠিয়া দুর্গাপুর আসনে নির্যাতিত, মামলা হামলার শিকার এমন পাঁচজন মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ছিলেন। এদের মধ্যে থেকে কাউকে মনোনয়ন না দিয়ে যার নামে কোন মামলা নেইÑ এমন একজনকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা হয়েছে। এ আসনে এক ডজন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
তবে রাজশাহী-১, রাজশাহী-২ ও রাজশাহী-৬ আসনে চাপা ক্ষোভ থাকলেও কেউ মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি তুলেনি। রাজশাহী-২ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক এমপি ও মেয়র মিজানুর রহমান মিনুর পক্ষে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন বলে অঙ্গিকার করেছে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সাবেক এমপি আমিনুল ইসলামকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পরপরই লাগাতার আন্দোলন করে যাচ্ছে বিএনপির বঞ্চিত নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপির মনোনয়ন পরিবর্তন না পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনরত মনোনয়নবঞ্চিতদের অনুসারীরা। আমিনুল ইসলামের বিরোধিতা করছেন দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ারা। তাদের অনুসারীরা করছেন বিক্ষোভ। এই আসনে মনোনয়নবঞ্চিতরা এক হয়েছেন আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে বিএনপি মনোনিত প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকরা। এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফারজানা শারমিন পুতুল। তার আপন ভাই ও জেলা বিএনপির সদস্য ইয়াসির আরশাদ রাজনও বিরোধিতা করছেন। এছাড়াও বিরোধিতা করছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুও। টানা কয়েকদিন থেকে পুতুলের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে এ আসনে বিক্ষোভ চলছে। তবে নাটোর-৩ আসনে প্রার্থী না ঘোষণা করাতে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।
নওগাঁ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করছে মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থী জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য প্রয়াত আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনির সমর্থকরা। এই আসনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজলে হুদা বাবুলকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। নওগাঁ-৫ (সদর) আসনে প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। ধারণা করা হচ্ছে জোট হলে এই আসনটি ছাড়া হবে। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতারা তা মানতে নারাজ।
প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে সংঘর্ষও হয়েছে হয়েছে জয়পুরহাট-২ আসনে। এ আসনটিতে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক আমলা আব্দুল বারী। এতে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফার সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হন। মোস্তাফার অনুসারীরা ডিসি বারীকে ‘অতিথি পাখি’ অ্যাখ্যা দিয়ে তার দলীয় মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তারা বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করছেন। মনোনয়নবঞ্চিত মোস্তফার কর্মী-সমর্থকরদের সঙ্গে আব্দুল বারীর সমর্থকদের সংঘর্ষও হয়।
বগুড়া জেলার ৭টি আসনের মধ্যে ৬টিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আছেন। এই দুই প্রার্থীকে ঘিরে গোটা জেলাতে উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তারা প্রচারণা শুরু করেছেন।
সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু বাকি রাখা হয়েছে সিরাজগঞ্জ-১ আসন। তবে এই জেলাতেও কোনো প্রার্থী পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
পাবনা-৩ আসনে কৃষকদলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। তবে এ সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ ওই আসনের নেতাকর্মীদের একাংশ। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রার্থী দাবি করেছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীসহ স্থানীয় ওইসব নেতাকর্মীরা।
দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত অনেক নেতা বঞ্চিত হওয়ায় তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ থেকে এই সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সংঘাত নিরসনে দলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সে সঙ্গে প্রয়োজনে প্রার্থীদের নিয়ে বসে দ্বন্দ্ব নিরসনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে দলের জন্য নির্যাতিত হয়েছেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক। গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে আগামী নির্বাচন ঘিরে মনোনয়নকে দলের কাছে মূল্যায়িত হওয়ার অংশ হিসেবে দেখেছেন তারা। দীর্ঘদিনের নিপীড়িত-নির্যাতিত এসব নেতাকে ঘিরে স্বপ্ন বুনছেন তাদের কর্মী-সমর্থকরা। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিতর্কিত প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।