নওগাঁ-১ আসনে কার মাথায় উঠবে জয়ের মুকুট, ত্রি-মুখী লড়াইয়ের আভাস
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ও ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থীকে মোকাবিলা করার পাশাপাশি তাঁকে লড়তে হচ্ছে নিজ দলেরই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর বিরুদ্ধেও। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীর ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী (হাতপাখা) প্রতীকের আব্দুল হক শাহ্।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জোটবদ্ধভাবে অংশ নেওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে (২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৮ সাল) এই আসনটি বিএনপিকে ছাড় দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে।
এই আসনে স্বতন্ত্রসহ পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যেই ভোটের মূল লড়াই হবে বলেই ধারণা করছেন স্থানীয় ভোটার ও কর্মী সমর্থকদের। ফলে ভোটের হাওয়ায় আলোচনারও কমতি নেই। চলছে কানাঘুষা কে জিতবে এই আসনে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এখানকার নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ভর করবে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও সক্রিয়তা এবং ইসলামী ভোটব্যাংকের বিভাজনের ওপর। এছাড়া আওয়ামী লীগের ভোটাররা জয়-পরাজয় নিশ্চিতে একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
নওগাঁ-১ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। তাঁরা হলেন, নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুল আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুল হক শাহ্, জাতীয় পার্টির প্রার্থী আকবর আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়াতমপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডাঃ ছালেক চৌধুরী।
এই পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে তিনজনের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীী ছালেক চৌধুরী ছাড়া অন্য দুইজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারেননি। সদ্য বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা ছালেক চৌধুরী নওগাঁ-১ আসন থেকে বিএনপি মনোনয়নে তিনবার (ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে এবার তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। তিনি মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীী ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করলেও তিনি বিতর্কিত ওই নির্বাচনে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের কাছে হেরে যান।
ওই নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ৪৪ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন করলেও নির্বাচিত হতে পারেননি।
জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুল হক শাহ্ এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।
নওগাঁর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভোটার নওগাঁ-১ আসনে। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৪, পুরুষ ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৭ এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির সাবেক সাংসদ ডাঃ ছালেক চৌধুরী ও বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দুই ধারায় বিভক্ত নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলা বিএনপি।
অতীতে তাঁরা দুজনেই আলাদা আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন। এবার দুজনেই মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে।
এ ঘটনায় ছালেক চৌধুরীর কর্মী-সর্থকেরা সমাবেশ ও মিছিল করে প্রার্থীতা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ছালেক চৌধুরী দলীয় সিদ্ধন্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
ছালেক চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হয়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের জন্য দল থেকে নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তাতে সাঁড়া দেননি।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গত ৫ জানুয়ারি প্রাথমিক সদস্যসহ দলীয় পদ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। ছালেক চৌধুরী স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে থাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ছালেক চৌধুরীর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালানোর অভিযোগে তিন উপজেলায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিন উপজেলাতেই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের সকল ইউনিটের নেতাকর্মীরা আমার পক্ষে কাজ করছে। দলের মধ্যে বর্তমানে কোনো বিভক্তি নাই।
ছালেক চৌধুরী অনেক আগে থেকেই দল থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের ভোটে কোনো প্রভাব পড়বে না। বিএনপির ভোট ব্যাংকে কোনো বিভাজন ঘটেনি। এছাড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাঁড়া পাচ্ছি। এই আসনে ৮০ হাজারের ওপর সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী ডাঃ ছালেক চৌধুরী বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের চাপে প্রার্থী হয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি লড়াই করে যেতে চাই। এটাই আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। প্রচার-প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষের যথেষ্ট সাঁড়া পাচ্ছি।’
অন্যদিকে নওগাঁ-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুল হক শাহ্ এর অবস্থান এলাকায় শক্ত হওয়ায় ইসলামী ভোটব্যাংকের বিভাজন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জামায়াতের প্রার্থীর জন্য জয়ের সমীকরণ জটিল হয়ে পড়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা জানান, নওগাঁর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে নওগাঁ-১ আসনসহ পাঁচটি আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁ-১ আসনে তাঁদের সাংগঠনিক ভিত্তি সবচেয়ে শক্তিশালী। এই এলাকায় ইসলামী আন্দোলনের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
ইসলামী ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।
নারী-পুরুষ দলগতভাবে আমাদের নানামুখী প্রচারণা চলছে। এলাকার মানুষ বলছেন, আমাদের অবস্থান ভালো। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী থাকলেও কোনো সমস্যা হবে না। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।