ইদের আগে বেড়েছে মৌসুমী ভিক্ষুকদের আনাগোনা
শুক্রবার দুপুর একটা। রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার বড় মসজিদের সামনে দেখা মিলল শ’খানেক ভিক্ষুকের। বড় মসজিদ থেকে জিরোপয়েন্ট মোড় পর্যন্ত দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে বসে আছে। সুস্থ-সবল ভিক্ষুকের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের শিশু ভিক্ষুকরাও রয়েছে। দেখা মিলেছে বিকলাঙ্গ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকদের। তবে সংখ্যায় অনেক কম।
এদিন শুধু সাহেববাজার বড় মসজিদ না। শাহমখদুম দরগা জামে মসজিদ, হেতেমখাঁ গোরস্থান, টিকাপাড়া গোরস্থান ও বিভিন্ন মসজিদের সামনে দেখা মিলেছে ভিক্ষুকদের। এছাড়াও প্রতিদিন বিভিন্ন শপিংমল ও মার্কেটের সামনে দেখা মিলছে ভিক্ষুকদের। তারা প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। কেউ কেউ এর চেয়ে বেশি ইনকামও করছেন।
রমজান মাসে ভিক্ষুকদের ঢল নেমেছে। নগরীর প্রতিটি মসজিদ থেকে শুরু করে গোরস্থান ও বিভিন্ন মাজারে নিয়মিত ভিক্ষুকদের পাশাপাশি মৌসুমী ভিক্ষুকদের উপস্থিতির দেখা মিলছে। মসজিদ ও কবরস্থানের সামনে এবং যাওয়া আসার রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে ও বসে ভিক্ষুকরা অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়াও নগরীর ব্যস্ততম এলাকা, শপিংমল, মার্কেট ও সড়কের পাশে দেখা মিলছে এসব ভিক্ষুকদের। অনেকেই হচ্ছেন ভিক্ষুকদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ।
নগরীর গণকপাড়া এলাকায় দুই বছর বয়সী শিশুকে নিয়ে ভিক্ষা করছেন ফাতেমা। ছেলেকে একটি চটের উপর শোয়ানো আছে। ফাতেমা বলেন, আমার ছেলেকে নিয়ে নওগাঁর ধামইরহাট থেকে এসেছি। সন্তান জন্মের পর পরই স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আগে ঢাকায় গার্মেন্টেসে চাকরি করতেন। আমিও বাড়িতে ফিরে আসি। ওখানে একটা বাড়িতে কাজ করি। এছাড়াও গৃহস্থ্যের কাজ করি। বাড়িতে শুধু মা আছে বাবা নেই। ইদ একটু ভালো কাটাবো বলে রাজশাহীতে এসে ভিক্ষা করছি। ইদের আগের দিন চলে যাবো।
বড় মসজিদের সামনে আজিজুল ইসলাম (৫৫) নামের এক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, পাবনা থেকে শুক্রবার সকালে এসেছি। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানও এখানে আছে। সবাই মিলে ভিক্ষা করছি। প্রতি বছর ইদের আগে আসি। সবাই মিলে দিনে অন্তত ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারি।
এই আয় দিয়ে ইদের খরচ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলাম আমি। আগে আমি বাসের চালক ছিলাম। একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে। দুটি সন্তানের বয়স একেবারে কম। মানুষের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে চলতে হয়। কিন্তু ইদ আসলে সেভাবে কেউ সহযোগিতা করে না। এই শহরে পরিচিত মানুষ কম। তাই এখানে এসেছি।
গাইবান্ধা থেকে আসা ভিক্ষুক মরিয়ম বলেন, গত ১০ বছর ধরে আমি আমার দুই প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে ভিক্ষা করি। কোন সময় বগুড়ায় আবার রাজশাহীতেও আসি। চটে ঘুম পাড়িয়ে আমি মানুষের কাছে টাকা চাই। কেউ দেয়, কেউ দেয় না। তবে প্রতিদিন ভিক্ষা করলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা হয়। শুক্রবার অনেকেই ১০০/৫০০ টাকাও ভিক্ষা দেন। কিন্তু ভিক্ষুকের সংখ্যা বেশি হওয়াতে অনেকে বেশি টাকা দেন না। কারণ সবাইকেই বুঝ দিতে হয়।
বড় মসজিদের সামনে থাকা সুমাইয়া নামের ১৩ বছর বয়সের এক কিশোরী বলেন, মা অসুস্থ তাই আমি এসেছি। আমার বাবা টিকাপাড়া গোরস্থানে গেছেন। যা টাকা পাবো তাই দিয়ে আমি ও আমার ভাই ইদের জামা কিনবো। এখন পর্যন্ত ১২০ টাকা পেয়েছি। আরও কিছুক্ষণ থেকে বাসায় চলে যাবো।
রিমা নামের এক শিশুর মা আলেয়া বলেন, চাইলেই ভিক্ষা করার সুযোগ নেই। আমার মেয়ে রিমা ভিক্ষা করছে। কারণ শিশুদেরকে মানুষ বেশি ভিক্ষা দেয়। আমি নিজেও ভিক্ষা করছি। পুরাতন ভিক্ষুকদের কারণে এখানে ঠিকে থাকাই কষ্ট।
সাহেববাজারে নিয়মিত ভিক্ষুক জোহরা বেগম (৬০) বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে ভিক্ষা করতে বহু মানুষ আসে এখানে। গাইবান্ধা, ফরিদপুর, কুড়িগ্রামের মানুষ বেশি আসে। স্বামী রিকশা চালায়, গ্রাম থেকে রমজানের সময় স্ত্রীকে নিয়ে আসে ভিক্ষা করাতে। এদের ব্যবসাই এটা। নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় বাসায় থাকে তারা। আবার ভিক্ষা করতে একসাথে আসা কয়েকজন মিলেও ঘর ভাড়া নেয় এক মাসের জন্য।
তিনি বলেন, মৌসুমী ভিক্ষুকদের কারণে প্রকৃত অসহায়রা বঞ্চিত হয়। আমি সাহেববাজারে এক সময় বিভিন্ন হোটেলে কাজ করেছি। অসুস্থ হয়ে গিয়ে এখন আর ভারী কাজ করতে পারি না। তাই মানুষের কাছে দুই-চার টাকা সাহায্য নিয়ে চলি। পরিচিত মানুষজন যদি কিছু দেয়, জোর নাই। কিন্তু যারা রমজানের এক মাসের জন্য আসে তারা সারাটা দিন ঘোরে, ফাঁকে ফাঁকে পানি খাবে, বেশিরভাগই রোজা রাখে না। তারা সামনে পেলে পথচারিকে ভিক্ষার জন্য বিরক্ত করে। তখন আমরা সামনে গেলে আর কেউ ভিক্ষা দিতে চায় না।
সাহেববাজার বড় মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়েন ফার্মেসি ব্যবসায়ী শামীম হোসেন। তিনি বলেন, আমি এখানে চার ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। কিন্তু অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ভিক্ষুকের উপদ্রব বেশি। নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর টাকা চায়। যারা এখানে নিয়মিত ভিক্ষা করে তারা চিনে তাই চায় না। একজনকে দিতে গেলে আরও ১০ জন এসে ধরে। অনেক ছোট ছোট ভিক্ষুক কাপড় ধরে টানাটানি করে।
সোহেল চৌধুরী নামের এক মুসল্লি বলেন, ভিক্ষুকদের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, পুরো রাস্তাটা ভিক্ষুকদের দখলে ছিল। আসা-যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান ভিক্ষুকরা। রিকশা থেকে নামার পড় ভিক্ষা চাওয়া শুরু হয়। ছোটরা কাপড় ধরে টানাটানিও করে।