নাটোরে জ্বালানি সংকটে বোরোর আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তা
বোরো ধানের ভরা মৌসুমে নাটোরে দেখা দিয়েছে তীব্র ডিজেলের সংকট। সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্থানীয় বাজারে ও ডিপো গুলো চাহিদামতো ডিজেল সরবরাহ না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন জেলার হাজারো প্রান্তিক কৃষক।
সেচ পাম্প চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারায় একদিকে জমি ফেটে গেছে, কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে এবং শহরে ঘুরে কোথাও তেল না পেয়ে পরে হাফ লিটার, এক লিটার করে তেল এনে কোন মতে সেচ পাম্প চালাতে হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ে এজেন্টরা সামান্য পরিমাণে ডিজেল দিলেও অনেক পাম্প মালিক চাহিদা মতো সরবরাহ করছেন না। পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদা মতো সরবরাহ না থাকায় অর্ধেকেরও কম ডিজেল দিতে পারছেন তারা।
বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুরে নাটোরের বিল-হালতি-খোলাবাড়িয়া ও বৃহত্তর চলনবিলে, মাঠে দেখা যায়, তেলের সংকটে কৃষি জমিতে চাষ করতে না পেরে কৃষক তার জমিতে নিজেই কোদাল দিয়ে চাষ করছেন। আবার কেউ সামান্য তেল পেয়ে কৃষিযন্ত্র দিয়ে জমি প্রস্তুত করছে, অন্য কৃষক তার বোরো আবাদের জমি ঘুরে ঘুরে দেখছেন।
তাদের মতে, এখন জমিতে পানির খুব দরকার, অথচ দোকানে দোকানে ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। পানির অভাবে জমি শুকিয়ে গেছে, ধান গাছে লালচে ভাব ধরেছে। এভাবে চললে পথে বসতে হবে।
একই সমস্যার কথা জানান, হালতি বিলের কৃষক আলতাব আলী। তিনি বলছেন, নলডাঙ্গা, নাটোর দিঘাপতিয়া, হাগুরিয়া পাম্প থেকে তেল পাইনি ।
অন্য কৃষক বলছেন. অনেক দোকানে তেল থাকলেও তারা বিক্রি করছে না। আবার কোথাও কোথাও নির্ধারিত ১০৫ টাকার ডিজেল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, এমনকি তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ইদের পূর্ব থেকে তারা কোন তেল পাচ্ছে না, এতে তাদের আবাদি জমি পিঁয়াজ, ভূট্রা, রসুনে সেচ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, জেলার ৩৩টি তেল পাম্প ও ২৫ জন ডিপো এজেন্ট কাছে তারাও চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাচ্ছেন না। ডিজেল না পাওয়ায় অনেক কৃষক সেচ পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার কৃষক রফিক বলেন, ডিজেলের সংকটের কারণে গত তিন দিন ডিজেল পাইনি। ফলে সেচ পাম্প বন্ধ রেখেছি।
ঢাল সড়ক এলাকার শামীম বলেন, ৪টি পেট্রল পাম্পে গিয়েও ডিজেল পাইনি। শহরের হাফরাস্তা পাম্পে গিয়ে মাত্র ২ লিটার ডিজেল পেয়েছি। এই ২ লিটার না পেলে ভুট্টার জমিতে সেচ বন্ধ রাখতে হতো।
সদর উপজেলার ছাতনীর হেলাল বলেন, সপ্তাহে ৫ দিন সেচ দিতে ১০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। গ্রামে ডিজেল না পেয়ে শহরের স্টেশন বাজারে এসেছি, কিন্তু যানবাহন ছাড়া ডিজেল দেয়া হচ্ছে না, বিপাকে পড়েছি।
নাটোর কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় মোট ৪৬ হাজার ৩৪৭টিসেচ পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ চালিত প্রায় ৬ হাজার সেচ পাম্প আর ৩৯ হাজারের বেশি ডিজেল চালিত সেচ পাম্প আছে। এবার ৫৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এ বোরো আবাদে ১০ হাজার ডিজেল চালিত সেচ পাম্প চলমান রয়েছে।
নাটোর জেলা পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার ৩২টি পেট্রল পাম্প ও ২৫ জন এজেন্টকে তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিজেল সঠিকভাবে পাচ্ছি না, ৯ হাজার লিটার চাইলে দেওয়া হচ্ছে তার অর্ধেক। যারা কৃষি কাজের জন্য তেল নিতে আসছে তাদেরকে তেল দিতে পারছি না। কারণ যারা নিয়মিত যানবাহনে তেল নেয় তাদের দেওয়াই কঠিন হয়ে পরেছে । কৃষি কাজের জন্য ডিজেল বেশি দেয়া দরকার বলে মনে করছেন তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, চলতি বছর জেলায় প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ফসল উৎপাদন ব্যাহত না হয় সেদিক নিয়ে কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। কোথাও বেশি দামে ডিজেল বিক্রি হলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে
এছাড়া কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল এমরান খান জানান, ডিজেল বিক্রির দোকানগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশি দামে তেল বিক্রির অপরাধে একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মোটা অংকের অর্থ জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।