সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

শান্তি আলোচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: সমঝোতার পথটা বন্ধ নয়, বন্ধুর

সোনার দেশ ডেস্ক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০০ অপরাহ্ন
শান্তি আলোচনায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: সমঝোতার পথটা বন্ধ নয়, বন্ধুর
ছবি: এআই (জেমিনি)

যুদ্ধের ৪৩ দিনের মাথায় আলোচনার টেবিলে বসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের প্রথম এ সরাসরি আলোচনা শেষমেশ কোথায় ঠেকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, সমঝোতায় পৌঁছানোর পথটা হয়ত বন্ধ নয়, তবে বন্ধুর।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালি ও লেবাননের যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুপক্ষের মতবিরোধ রয়েছে। বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অনাস্থাও।

এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে নতুন করে সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।

আলোচনায় মধ্যস্থকারীর ভূমিকায় থাকা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও সেই ঝুঁকি দেখছেন।

তার ভাষায়, “আলোচনা সফল হতে পারে, ব্যর্থও হতে পারে। ব্যর্থ হলে আরেক দফা সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।”

আল জাজিরা লিখেছে, ইরান যে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, তাদের সবারই বিস্তর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

‘মিনাব ১৬৮’ নামে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে আছেন পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে চার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীও আছেন, যাদের কূটনৈতিক দর কষাকষিতে বেশ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে আছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু বেকার ও এশীয় বিষয়ক উপদেষ্টা মাইকেল ভ্যান্সও আছেন মার্কিন প্রতিনিধিদলে।

শনিবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আলোচনায় বসেন দুই দেশের এসব প্রতিনিধি। প্রথম দফার আলোচনা চলে রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত। এরপর দ্বিতীয় দফার আলোচনায় চুক্তির বিষয়ে লিখিত বার্তা আদান-প্রদান করে দুই পক্ষ।

মধ্যরাতের দিকে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেলের বরাতে রয়টার্স জানায়, রাতেই তৃতীয় দফায় আলোচনায় বসবেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

এদিকে তেহরানের প্রতিনিধি দলের একজন সদস্যের বরাতে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, আলোচনা রোববারও গড়াতে পারে।

এর আগে এক খবরে হরমুজ প্রণালি ও লেবাননের বিষয়ে দুই পক্ষের ‘বড় ধরনের’ মতবিরোধ তৈরি হওয়ার তথ্য দেয় সংবাদ সংস্থাটি।

আল জাজিরা লিখেছে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর তারা গত কয়েক দিন ইরানের নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলেছে।

সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, যুদ্ধবিরতি হলে তা আদৌ টিকবে কিনা, তা নিয়ে ইরানিরা সন্দিহান।

তবে কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষমেশ সফল হলে ইরানের ওপর থেকে হয়ত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে।

কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দিহান ইরান সরকারও।

ফাতেমেহ মোহাজেরানি নামে ইরান সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, “পাকিস্তানে প্রতিনিধিদল পাঠানোটা তেহরানের আলোচনায় আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। তবে তাদের ‘আঙুল ট্রিগারেই থাকবে’।

“আমরা সংলাপে বিশ্বাস করি এবং যুক্তিসংগত আচরণ করি, কিন্তু আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করি না।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসের কথা এসেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির মুখ থেকেও।

তিনি বলেছেন, তারা ‘সম্পূর্ণ অবিশ্বাস’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ আলোচনা কেবল যুদ্ধবিরতির বিষয় নয়, এটি দুই দেশের ৪৭ বছরের শত্রুতা বা বৈরিতা অবসানের প্রশ্নও। ফলে এ আলোচনার মধ্য দিয়ে সবকিছু মিটমাট হয়ে যাবে, অতটা আশাবাদী নন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের’ গবেষক আবাস আসলানি মনে করেন, এ আলোচনাকে ‘চূড়ান্ত ফয়সালা’ হিসেবে দেখা যাবে না, দেখতে হবে একটি প্রক্রিয়ার ‘সূচনা’ হিসেবে।

“কয়েক দিন আগে আমরা যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা শুনলাম, কেউ কেউ ভেবেছিলেন, সব বোধহয় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, সমেঝোতায় পথটি হয়ত অবরুদ্ধ নয়, তবে বন্ধুর।”

দর কষাকষিতে যা যা থাকতে পারে

তেহরান শুরু থেকে বলে আসছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতিও আলোচনার সূচিতে থাকতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলেছে, লেবাননে হামলার বিষয়টি যুদ্ধবিরতির অংশ নয়।

দর কষাকষি হবে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়েও। ইরান চাইছে, তাদের অবরুদ্ধ সব সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হোক।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে, তারা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি আছে, তবে ইরানকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে আসতে হবে।

মতবিরোধ আছে হরমুজ প্রণালি নিয়েও। গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে একচ্ছত্র কর্তৃত চায় তেহরান; জাহাজ থেকে টোল আদায়ের দাবিও আছে তাদের।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তেলবাহী জাহাজসহ অন্যান্য নৌযানকে কোনো বাধা বা টোল ছাড়াই চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।

ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে ইরানের সামরিক ও বেসামরিক খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা এগুলোর ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।

ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি চায়। কিন্তু ওয়াশিংটন এতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ বিষয়ে ‘কোনো আলোচনা হবে না’।

আবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সীমিত করা হোক। কিন্তু এ বিষয়ে তেহরানের বক্তব্য ট্রাম্পের মতোই— ‘ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আলোচনার বিষয় নয়’।

আলোচনায় দর কষাকষি হতে পারে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি নিয়েও।

তেহরান বলছে, তাদের আশপাশের দেশ থেকে মার্কিন বাহিনীকে চলে যেতে হবে।

এ বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য হলো, শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বহাল থাকবে।

না থেকেও ছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প

ইসলামাবাদের আলোচনায় সশরীরে ছিলেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একের পর এক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় থেকেছেন তিনি।

তবে ইসলামাবাদে অবস্থানরত মার্কিন প্রতিনিধি দলের তরফে যে ধরনের বার্তা এসেছে, ট্রাম্পের কথাবার্তা ছিল তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা।

সবশেষ পোস্টে তিনি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তীব্র সমালোচনা করেন।

‘ভুয়া সংবাদ মাধ্যম’ মন্তব্য করে তিনি লেখেন, “ইরানের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। তাদের নেতৃত্ব এখন মৃত!”

হরমুজ প্রণালি শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে এবং খালি জাহাজগুলো এখন ‘মালামাল বোঝাই’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ‘ছুটে আসছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিবিসি লিখেছে, ট্রাম্প যখনই মনে করেন, অন্য কেউ তার চেয়ে বেশি মনোযোগ পাচ্ছে, তখনই তিনি নিজেকে নানাভাবে প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় দুই হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।

এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান।

জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা।

প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলা এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।

অনেক দেশে জ্বালানি পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। আর জ্বালানি পণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভীতিও তৈরি হয়েছে।

এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মানুষ যখন যুদ্ধের পরিসমাপ্তি চাইছে, তখন দুই দেশের এ আলোচনায় স্বাভাবিকভাবে সবাই চোখ রাখছে।

তবে ইসলামাবাদের হোটেলে যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বৈঠক চলছিল, তখনও দুপক্ষের কাছ থেকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসা বন্ধ ছিল না।

এদিন মার্কিন এক সামরিক কর্মকর্তার বরাতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস লিখেছে, দেশটির একটি যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে।

তবে ইরান এ খবর অস্বীকার করেছে বলে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তার বরাতে লিখেছে ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ