শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

বাঁশের দামে ভাটা পড়েছে কুটির শিল্পে নারীদের ব্যস্ততা

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩২ অপরাহ্ন
বাঁশের দামে ভাটা পড়েছে কুটির শিল্পে নারীদের ব্যস্ততা

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। বৈশাখের সকালে শহর বা গ্রামের বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা কিংবা আনন্দ আয়োজনে বাঁশ ও বেতের তৈরী ডালা, ঝুড়ি, কুলা, টোপা, চাঙরি, মোড়া, মাথাল, পলো, তালপাতার হাতপাখাসহ বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে দ্বিগুন হয়। গ্রামের বিভিন্ন এলাকার কুটির শিল্পে দক্ষ নারীদের ব্যস্ততাও বাড়ে এসময়। কিন্তু এবার বাঁশের মূল্য বৃদ্ধি ও বেত প্রায় অপ্রতুল হওয়ায় পরিশ্রমের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না গ্রামের নারীরা।


পাবনার ঈশ্বরদীর বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে বসবাসকারী নারীরাও এই সময়ে ব্যস্ত সময় পার করে থাকেন বাংলা নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের হাতে তৈরী বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করতে। সোমবার (১৩ এপ্রিল) ঈশ্বরদীর বহরপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায় নারীদের ব্যস্ততা। তবে ব্যস্ত হলেও তারা এখন শুধু এসব সামগ্রী তৈরীর ওপর এখন আর পুরোপুরি নির্ভর থাকতে পারেন না।


একদিকে বাঁশের দাম অত্যধিক বৃদ্ধি ও বেতের অপ্রতুলতা, অন্যদিকে প্লাস্টিক সামগ্রীর সহজলভ্যতায় কমতে কমতে বিলুপ্তির পথে এখন বাঁশ ও বেতের তৈরী সামগ্রীর ঐতিহ্য ও কুটির শিল্প। উৎসব ঘিরে এসব সামগ্রীর চাহিদা থাকলেও সারাবছর কুটির শিল্পের এসব হাতে তৈরী সামগ্রীর চাহিদা এখন আগের মত নেই বলে উল্লেখ করে আশ্রয়ন প্রকল্পের কুটির শিল্পী পপি রানী বলেন, উৎসবের সময়ে প্রতিদিন পরিবারের সদস্যরা মিলে ৩০-৪০ টি কুলা, ঝুড়ি, মোড়া তৈরি করি।


প্রকার ভেদে কুলা ১২০ টাকা, ঝুড়ি ১০০ থেকে দেড়শ’, ডালা ১০০ থেকে ১২০ টাকা হিসেবে বিক্রি হয়। তবে এখন অর্ডার পেলে কাজ থাকে অন্যথায় তারা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। তিনি বলেন, এখন শুধু এসব তৈরী করে আর সংসার চলে না। সময় সুযোগে পরিবারের বাড়তি উপার্জনের অংশ হিসেবে কাজ করা হয়। 


পপি রানীর স্বামী অন্তরবেদ কুমার বলেন ভালো একটি বাঁশে ১৫ থেকে ২০টি ডালা তৈরি করা যায়। এখন প্রকারভেদে একটি বাঁশ কিনতে হয় ৭শ’ থেকে এক হাজার টাকায়। দোলা রানী নামের এক নারী বলেন আমাদের স্বামীরা বেত বাঁশ কেটে দেয় আর আমরা এগুলো হাতে বুনন করে লাল, সবুজ, হলুদ রংসহ বিভিন্ন রঙে রঙিন করে ফুটিয়ে তুলি। তার স্বামী শ্রী শিবেল কুমার বলেন, এসব সামগ্রী তৈরী করতে বাড়ির ছোট বড় সবার সহযোগিতা লাগে তবে এসবের এখন আর তেমন চাহিদা নাই। তিনি বলেন, এখন প্লাস্টিকের তৈরী কুলা থেকে অন্যান্য সব ধরনের সামগ্রী সহজে পাওয়া যায় আবার অটো প্রসেস করা চাল এখন কুলায় ঝাড়ারও প্রয়োজন পড়ে না। ফলে বাঁশের তৈরী কুলার প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।


বাঁশের কুলার চাহিদা কমে যাওয়ার কারনে আমরা অন্য কাজের পাশাপাশি সময়ে অসময়ে কাজের ফাঁকে কুটির শিল্পের কাজ করি বাড়তি আয়ের আশায়। তবে বাঁশের দাম বৃদ্ধির কারনে পরিশ্রম করেও এসবে লাভ খুব কম হয় তাই এসব কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। গ্রামে আগে বাঁশের ডালা, কুলা, চালনা, ঝুড়ি, ডুলা, ঢুলি, মোড়া, চেয়ারের প্রচলন থাকলেও সময়ের ব্যবধানে এসবের চাহিদা এখন নেই বললেই চলে।


স্বপ্না রানী নামে আরেক কুটির শিল্পী বলেন, আমার স্বামী বাঁশ কেটে তৈরি করে দিলে একাই প্রতিদিন ১০টি ঝুঁড়ি অনায়াসে তৈরি করতে পারি। এখানকার বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা এখনো নিপুন হাতে ডালা, ঝুড়ি, সরপোশ, মোড়া তৈরি করেন। তবে শুধু বিশেষ বিশেষ কিছু অনুষ্ঠানে এই কুটির শিল্পের চাহিদা রয়েছে। পহেলা বৈশাখের আগে তাদের কাজের পরিমান বাড়ে তবে অন্য সময়ে কাজ থাকে না বললেই চলে। আধুনিকতার ভিড়ে গ্রামের এই কুটির শিল্প হারাতে বসেছে ঐতিহ্য।#