নাটোরে পেঁয়াজের কদম চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের
পেঁয়াজের কদম (বীজ) চাষে স্বপ্ন কৃষকদের। এ অঞ্চলে অন্য ফসলের চেয়ে দামে ভালো ও লাভজনক হওয়ায় কদমে কৃষকদের আগ্রহ ও চাষের পরিধি বাড়ছে। পেঁয়াজের সাদা কদম শুকিয়ে বের হয় কালো দানা বা বীজ, যার বাজারদর আকাশচুম্বী। এজন্য স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি কালো সোনা হিসেবে পরিচিত। পুরুষের পাশা-পাশি জমিতে পরিচর্যা ও পরাগায়ন করছে নারীরাও।
একটা সময় পেঁয়াজবীজ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর থাকলেও দিনে দিনে দেশে ‘কালো সোনা’খ্যাত পেঁয়াজবীজের আবাদ বাড়ছে। স্থানীয় ভাবে চাহিদা মিটিয়ে সারা দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনের জেলা হিসেবে পরিচিত জেলা নাটোর। পেঁয়াজ চাষের পাশাপাশি পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনেও আগ্রহী হচ্ছে এ জেলার কৃষক।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসে পেঁয়াজ বীজের চাষ শুরু হয়। ফুল পাকে চৈত্র মাসে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের ফুল ভালো হওয়া ও সময়মতো সার, বীজ পাওয়ায় কৃষকরা ভালো ফলনের আশা করছেন। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা জমিতে তিন থেকে সারে মণ পর্যন্ত দানা উৎপাদন হয়ে থাকে।
নাটোরের নলডাঙ্গায় মিনি কক্সবাজার খ্যাত হালতি-খোলাবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাচ্ছু মন্ডল গতবছর দশ কাঠা জমিতে আবাদ করে সত্তর কেজি পেঁয়াজের বীজ পেয়ে ছিলেন। এবছর এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজের কদম চাষ করেছেন তিনি।
শুধু বাচ্ছু মন্ডল নয়,এ উপজেলার হরিদাখলসি, পাটুল, বিলজুয়ানি, বাশিলা, সোনাপাতিল, আচড়াখালি, তেঘরিয়া, চেওখালিসহ বিভিন্ন এলাকায় বুধবার (১৫ এপ্রিল) সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় বিস্তীর্ণ ফসলি জমি জুড়ে চাষ হয়েছে পেঁয়াজের (কদম) বীজ। এসব জমিতে কেউ কীটনাশ স্পে করছে, সেচ দিচ্ছে, আবার কেউবা হাত ছোয়া দিয়ে পরাগায়ন করছে।
খোলাবাড়িয়া গ্রামের বাচ্চু মন্ডল জানান, প্রতি বিঘা জমিতে দানা আবাদে, সার, বীজ, সেচ, কীটনাশকসহ অন্যান্য সব মিলে খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মতো। প্রতি মণ দানা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজারদরে বিক্রি হয়। যদি পেঁয়াজের বাজার ভালো হয় তাহলে পেঁয়াজ বীজের দামও বেশী হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের ফুল ভালো হওয়া ও সার, বীজ সময়মতো পাওয়ায় কৃষক ভালো ফলনের আশা করছেন। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা জমিতে তিন থেকে সারে মণ পর্যন্ত দানা উৎপাদন হয়ে থাকে।
স্থানীয় রমজান আলী নামে এক কৃষকের মতে, এক বিঘা জমিতে ৮ মণ পেঁয়াজের প্রয়োজন হয়। এছারা সার-পাউশ, হাল-চাষ, শ্রমিক ও কীট নাশক এর খচর আছে। সব চেয়ে বেশী পরিশ্রম, প্রতিদিন দুই-তিন জন লোক দিয়ে হাত ছোয়াতে (পরাগায়ন) করতে হয় ।
তার মতে, প্রতি বিঘা জমিতে দানা আবাদে, সার, বীজ, সেচ, কীটনাশকসহ অন্যান্য সব মিলে খরচ হয় এক লাখ টাকার মতো। প্রতি মণ দানা ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজারদরে বিক্রি হয়।
আচড়াখালি গ্রামের চাষি কহির মন্ডল বলেন, গত বছর আমি সারে সাত শতক জমিতে পেঁয়াজের কদম আবাদ করছি, আমার খচর হয়ছে সত্তর হাজার টাকার মতো দানা পেয়েছিলাম ৪২ কেজির মতো। প্রতি কেজি তিন-চার হাজার টাকা করে বিক্রি করেছি। খরচ বাদ দিয়ে আমার এক লক্ষ টাকা লাভ ছিল। এবার আশা করছি ফলন বেশি হবে।
উপজেলার হরিদাখলসি গ্রামের কৃষক পলাশ, ছামাদ বলেন, প্রতিবছর আমরা পেঁয়াজের (কদম) চাষ করি, ফলনও ভালো পাওয়া যায়। এ বছর ৯ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের কদম চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো লাভবান হওয়ার আশা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি বৈশাখ মাসে শিলাবৃষ্টি নিয়ে। শীলা বৃষ্টি হলে পেঁয়াজের কদম নষ্ট হয়ে যায়। পেঁয়াজের কদমের বীজ আমাদের কাছে কালো সোনা হিসেবে পরিচিত। অন্য সব ফসলের চেয়ে বেশি দাম হওয়ায় আমাদের কাছে এটি সোনার মতো।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপ-পরিচালক মোঃ হাবিবুল ইসলাম খান বলেন, চলতি মৌসমে নাটোরে ১৩৬ হেক্টর থেকে বেড়ে তা ১৮৮ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের কদম চাষ হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৩৭ কোটি টাকা। গত বছর বেশ ভালো দাম পেয়েছিলেন চাষীরা। তাই এ বছর বেড়েছে ৫২ হেক্টর পেঁয়াজ বীজের চাষ।
পেঁয়াজের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বীজে বেশী লাভবান হওয়ায়, স্থানীয় কৃষকরা বীজ (কদম) চাষে আগ্রহ বেরেছে। কৃষি কর্মকতারাও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সহযোগিতা ও পরামর্শ দিচ্ছেন।