গণভোটের প্রচারে ব্যাংক খাত থেকে গেছে পৌনে ৪ কোটি টাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রচার কাজে দেশের ব্যাংক খাত থেকে মোট ৩ কোটি ৭২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের গড়া ‘স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন’, বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এবং হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) ওই টাকা দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল ‘কর্পোরেট সোশাল রেসপনসিবিলিটি (সিএসআর)’ তহবিল থেকে এক কোটি টাকা পায় স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন।
আর বেসরকারি ব্যাংকের নিবার্হীদের সংগঠন এবিবির তহবিল থেকে সুজনকে দুই কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
গণভোটের প্রচারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে সংগঠনের সাবেক মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশাসহ কয়েকজন নেতার এক সংবাদ সম্মেলন থেকে।
সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে সিনথিয়া জাহীন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফ থেকে গণভোটের পক্ষে দেশব্যাপী প্রচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রচারের অর্থায়ন কীভাবে হবে, এমন প্রশ্নে তখন বলা হয়, ব্যক্তিগত খরচে এই কর্মসূচি সম্পন্ন হবে।
কিন্তু পরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল গ্রহণ এবং কীভাবে তা ব্যয় করা হয়েছে, সেই তথ্য তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সিনিথিয়া জাহীন বলেন, ১২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে রিফাত রশিদ, হাসিব আল ইসলামসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা ‘স্বীকার করতে বাধ্য হন’ যে একটি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তারা কমপক্ষে এক কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন।
পরদিন ফেইসবুকে লাইভে এসে টাকা নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতির পদ ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দেওয়া রিফাত রশিদ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গণভোটের প্রচারের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তহবিল খুঁজছিল। এক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের কর্মকর্তা কিছু ‘বড় ভাই’ এ বিষয়ে তাদের সহযোগিতা করেন।
কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের রেজিস্টার্ড কোনো সংগঠন না হওয়ায় তহবিল পাওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। তখন তারা ফাউন্ডেশন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রস্তাব দিলে তার একটি অংশ অনুমোদন পায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফাউন্ডেশনটি যৌথমূলধনী ও ফার্মসমূহের অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হয় ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, অর্থাৎ গণভোটের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণভোট উপলক্ষে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশনকে আর্থিক সহায়তা বাবদ এক কোটি টাকা দেওয়া হয়।”
গণভোট ‘সফল’ করার লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনটি কাজের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে ওই ফাউন্ডেশন।
‘অনলাইন রেফারেন্ডাম প্রচারনা’, ‘রেফারেন্ডাম কনসার্ট’ আয়োজন এবং ‘স্ট্র্যাটেজিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এ ন্যাশনওয়াইড ইয়ুথ এনগেজমেন্ট ক্যাম্পেইন’–এই তিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ওই অর্থ চাওয়া হয়।
অর্থ খরচের পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
স্টুডেন্টস এগেইন্স্ট ডিসক্রিমিনেশন ফাউন্ডেশন সেই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জানিয়ে আরিফ হোসেন খান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে রিপোর্ট পর্যালোচনায় রয়েছে।’’
অন্যদিকে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের নির্দেশনায় সুজনকে মোট ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা গণভোটের প্রচারের জন্য দেওয়া হয় বলে এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের ভাষ্য।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তৎকালীন গভর্নর মহোদয় এবিবির নেতাদেরকে তার অফিসে ডাকেন। তিনি (গভর্নর) ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বড় অংকের টাকা ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারের জন্য দিতে বলেন।’’
মাসরুর আরেফিন বলেন, ওই অর্থ দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে লিখিত নির্দেশনা চেয়েছিল এবিবি। ব্যাংক পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া যাবে না বলেও জানিয়েছিল। তখন ঠিক হয়, ব্যাংকের বদলে এবিবির তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হবে।
“এখানে যা কিছু হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এবিবির নেতাদের পরপর দুটি মিটিংয়ে নির্দেশনা প্রাপ্তির মাধ্যমে হয়েছে। এবিবি তহবিল থেকে সুজনকে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২০ লাখ ৮৪ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তারা খরচের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।”
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে দেওয়া টাকার নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা পড়ার কথাও বলেন এবিবি চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সংস্কার ও সুশাসনের জন্য আমরা কাজ করে আসছি। গণতন্ত্র দুর্বল হলেও সুশাসন ঠিক থাকলে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত কম হয়। এবিবি থেকে যে অর্থ খরচ করা হয়েছে, তা স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে, প্রতিটি টাকার হিসাব আছে। মানুষকে সচেতন করতে এ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি বলেন, “আমরা খরচের প্রাথমিক হিসাবটি দিয়েছি। এখন অডিট চলছে, অডিট শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ অডিটেড রিপোর্ট দেওয়া হবে। এটা ব্যাংকের টাকা মানে জনগণের টাকা। টাকা রাষ্ট্র ও জনকল্যাণে খরচ করা হয়েছে। আমাদের কার্যক্রমকে থামিয়ে দিতে একটি গোষ্ঠী সুজনের অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ