নারায়ণগঞ্জে ‘কাউন্সিলরের’ ২ বাড়িতেই ৩১৮ ভোটার, অস্বাভাবিক বলছে ইসি
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খানপুর মোকরবা রোডের ৫৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের একটি টিনসেড বাড়ি। এ বাড়িতে ভাড়া থাকে মাত্র পাঁচটি পরিবার। কিন্তু এ বাড়ির ঠিকানায় ভোটার হয়েছেন ১৮২ জন।
একই সড়কে আরেকটি তিনতলা বাড়িতে থাকে ছয়টি পরিবার। তাদের মধ্যে বাড়িওয়ালা ও তার ভাইয়ের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। এ বাড়ির ঠিকানাতেও ১৩৬ জন ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন।
এ বাড়ি দুটির মালিক একই ব্যক্তি- অহিদুল ইসলাম ছক্কু, যিনি সদ্য সাবেক কাউন্সিলর।
একই সড়কের আরও দুটি বাড়িতে ১২০ জন ভোটার তালিকাভুক্ত।
নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, একই হোল্ডিংয়ে এত ভোটার অস্বাভাবিক। বাড়ির ধরন ও স্বাভাবিকতার হিসেবে এখানে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ জনের বেশি ভোটার তালিকাভুক্ত থাকার কথা না।
কীভাবে এমনটা হয়েছে তা তারাও যাচাই-বাছাই করার প্রক্রিয়ার দিকে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই হোল্ডিংয়ে অস্বাভাবিক ভোটার থাকার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। তারা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনেও তুলেছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার আগে ২৪ নভেম্বর ভোটার তালিকা প্রকাশ করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। ওই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ নগরীর ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ‘নগর খানপুর’ বলে পরিচিত এলাকার মোকরবা রোডের ৫৬, ৪৩/১, ৪৯ ও ৫১ হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় ৪৩৮ জন ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। যদিও এ এলাকায় মোট ভোটারই রয়েছেন এক হাজার ৩৩৬ জন।
নির্বাচন কার্যালয় সূত্র বলছে, ওই চার হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় নিবন্ধিত ভোটারদের কেউ কেউ সর্বশেষ হালনাগাদ ভোটার তালিকায় যুক্ত হলেও অনেকে আগেই ভোটার হয়েছেন। কিন্তু তাদের ঠিকানা হিসেবে এই হোল্ডিং নম্বরের বাড়িগুলো রয়েছে।
এদিকে, চার বাড়ির দুটির মালিক অহিদুল ইসলাম ছক্কু স্থানীয় বিএনপি নেতা। একটি বাড়িতে তিনি নিজেই থাকেন। অপর টিনসেড বাড়িটি ভাড়া দেওয়া এবং সেখানেই তার কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।
মোকরবা রোডের ৫৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একপাশে আছে কাউন্সিলরের কার্যালয় এবং অপরপাশের ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া। সেখানে থাকে পাঁচটি পরিবার। তারা সবাই কর্মজীবী। কেউই স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাদের অনেকে এ ওয়ার্ডের ভোটারও নন।
এ বাড়ির ভাড়াটিয়া রেস্তোরাঁ কর্মী মো. তানভীরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দেড় বছর আগে এই ভাড়া বাড়িতে ওঠেন তারা। তবে, এই বাড়ির ঠিকানায় তারা ভোটার হননি।
তানভীর নিজে এখনো ভোটার হননি, তবে তার মা তাসলিমার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখান। সেখানে ঠিকানা হিসেবে পাশের এলাকা পশ্চিম তল্লার ‘দুলু মিয়ার বাড়ি’ লেখা রয়েছে। তাদের স্থায়ী ঠিকানা পটুয়াখালী জেলায়।
এই বাড়িতে আরও ১৬ জন থাকেন। তাদের মধ্যে অনুর্ধ্ব ১৫ বছর বয়সী দুজন সদস্য রয়েছেন। যারা এখনো ভোটার হননি। কিন্তু সাবেক কাউন্সিলর অহিদুল ইসলাম ছক্কুর এ বাড়িটিতে ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন ১৮২ জন।
কয়েক কদম এগিয়ে গেলে অহিদুলের আরও একটি তিনতলা রয়েছে। এ বাড়ির হোল্ডিং নম্বর ৪৩/১ মোকরবা রোড। পুরনো নকশার এ বাড়িটির একটি ফ্ল্যাটে নিজেই থাকেন অহিদুল, অপর একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন তার ভাই। এ ছাড়া, আরও চারটি পরিবার বাড়িটিতে ভাড়া থাকে।
এ বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. হাসান বলেন, তার পরিবারে তিনজন সদস্য। তিনি নিজে গাজীপুরের ভোটার হলেও স্ত্রী আকলিমা এ ওয়ার্ডের ভোটার। কিন্তু তার ঠিকানা ৩০ নম্বর মোকরবা রোড।
একই ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর হোল্ডিংয়ে গত ১০ বছর ধরে ভাড়া থাকছে চারটি পরিবার। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১৪ জন। যাদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং একজন ভোটার হয়েছেন গত বছর। বাকিরা আগেই ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এই হোল্ডিং নম্বরে ভোটার তালিকাভুক্ত আছেন ৪৭ জন।
বিষয়টি শুনে অবাক হন এ বাড়ির বাসিন্দা আফরোজা আক্তার। মধ্যবয়সী এ নারীর বোন পিয়ারি আক্তারও এ বাড়ির ভাড়াটিয়া।
আফরোজা বলেন, “আমরা এ বাড়িতে অনেক বছর ধরে থাকি। এইখানেই ভাড়া থাকছি। নতুন কেউ ভাড়াটিয়া এইখানে আসার তো কোনো কারণই নাই।”
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১১ নম্বর ওয়ার্ডের মোকরবা রোড খানপুর এলাকার মোট ভোটার এক হাজার ৩৩৬ জন। যার মধ্যে নারী ভোটার ৭০০ এবং পুরুষ ভোটার ৬৩৬ জন। এই ভোটার সংখ্যার মধ্যে চারটি হোল্ডিংয়ে ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন ৪৩৮ জন। যা অস্বাভাবিক বলে জানাচ্ছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার কাছে এ এলাকার ভোটার তালিকা নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর্যবেক্ষণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অনলাইন ডাটাবেজে সার্চ করে দেখা যায়, অধিকাংশ ভোটারদের যাচাইকারী ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সত্যায়নকারী হিসেবে অহিদুল ইসলাম ছক্কুর নাম পাওয়া যায়।
উদাহরণ হিসেবে মোকরবা রোডের ৫৬ হোল্ডিং নম্বরের ঠিকানায় ২০২৩ সালে ভোটার হন অভয় চৌহান। তার স্থায়ী ঠিকানা সিলেটের হবিগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন তিনি। তার কাগজপত্র সত্যায়িত করেছেন অহিদুল। তিনি ওই সময় ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর সারাদেশের সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের সরিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
নির্বাচন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “একই হোল্ডিংয়ে বেশি ভোটার হতে পারেন কিন্তু সেক্ষেত্রে ওই বাড়ির পরিধি এবং বাসিন্দাদের সংখ্যার উপর নির্ভর করে। কিন্তু এই ওয়ার্ডের বিষয়টি অস্বাভাবিক। কেননা বাড়িগুলোতে এই পরিমাণ ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া, যারা ছয় মাস কিংবা এক বছরের জন্য কোথাও ভাড়া থাকেন তারা ওই ঠিকানায় ভোটার হতে খুব একটা উৎসাহীও হন না।”
এ ধরনের কাজ সাধারণত ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমের সময় হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে মন্তব্য করে এই কর্মকর্তা বলেন, “একই হোল্ডিং নম্বরে ভোটার করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক নেতার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকে। কেননা, এতে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষজনের ভোটগুলো রিজার্ভ থাকে, যা ভোটের সময় বেনিফিট দেয়।”
এদিকে, ওই ওয়ার্ডের জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি মো. খোরশেদ আলমও বলছেন, “ভোটার নিবন্ধনের সময় এই কারসাজি করেছেন অহিদুল ইসলাম ছক্কু। তিনি যখন কাউন্সিলর ছিলেন তখন এই কাজটি বেশি করেছেন। শুধু তার বাড়িই না, তার আত্মীয় ও বন্ধুর বাড়িতেও সে এইভাবে ভোটার করেছেন বলে জেনেছি। এবং ওই ভোটারদের তিনি নানা সুযোগ-সুবিধাও দিয়ে থাকেন যাতে ভোটের সময় তিনি সুবিধা নিতে পারেন। ফিক্সড ভোটার করার কারসাজি এটি।”
খোরশেদ আসন্ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এ ওয়ার্ড থেকে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীও। তিনি বলেন, একই হোল্ডিংয়ে অস্বাভাবিক ভোটার নিবন্ধনের বিষয়টি তিনি দলে আলোচনা করবেন এবং এ বিষয়ে প্রতিকারের দাবি জানাবেন নির্বাচন কমিশনে।
যোগাযোগ করা হলে অহিদুল ইসলাম ছক্কু একই হোল্ডিংয়ে বেশি পরিমাণে ভোটার নিবন্ধনের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাজের সুবাদে এলাকায় থাকা অস্থায়ী ভাড়াটিয়াদের সহযোগিতা করার জন্য তিনি নিজের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ভোটার নিবন্ধন করিয়েছেন।
“ভোটার হতে বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স, বিদ্যুৎ বিল লাগে। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা অনেক সময় বাড়িওয়ালার কাছ থেকে এগুলো পান না। আমি যেহেতু কাউন্সিলর তাই লোকজনকে সহযোগিতা করেছি মাত্র।”
তবে, নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে এই কাজ করেননি দাবি করে তিনি বলেন, “এই কাজে আইনি কোনো বাধা নেই। আর আমি ভোট পাই মানুষের জন্য কাজ করে। কাজ না করলে মানুষ আমাকে ভোট দেবে কেন? জনগণ ভোট দেয় এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ দেখে।”
নির্বাচন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের জেলা সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েলও বলছেন, “ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য আগেও এই কাজ করেছেন। এই উদাহরণ আমরা সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও দেখেছি। ভোটারদের স্থানান্তর করে কিছু আসনে ভোটার বাড়ানোর অভিযোগ ছিল জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মকর্তাদেরও গাফিলতি থাকে।”
এই ধরনের কাজ ‘পুরোপুরি অবৈধ’, বিষয়টিকে খতিয়ে দেখে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রণয়নের তাগিদ দেন ধীমান।
তিনি বলেন, “যদি কারসাজি করে এই ধরনের তালিকা করা হয়ে থাকে এবং তা প্রমাণিত হয়, তাহলে ওই ভোটার তালিকা বাতিল করা উচিত। নইলে কোনো একক ব্যক্তি নির্বাচনে অতিরিক্ত সুবিধা নেবে, যা সুষ্ঠু ভোটের অন্তরায়।”
এদিকে, জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “ভোটার তালিকা করার সময় ভ্যালিড ডকুমেন্টস যাচাই করেই করা হয়ে থাকে। যদিও অনেক সময় এইসব কাগজপত্র কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় থেকেই সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম করার সুযোগ থেকেই যায়। তারপরও একই হোল্ডিংয়ে যদি অস্বাভাবিক ভোটার থেকে থাকে তা তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করা হবে।”
তদন্তের পর এই বিষয়ে কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা