দারিদ্র্য জয়ের গল্প: ইউসেফের প্রশিক্ষণে বদলে গেল আফসানা মীমের জীবন
একসময় সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতেন আফসানা মীম। ছয় বছরের ছোট্ট মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ত্বে চোখ ভিজে যেত প্রায়ই। স্বামীর সামান্য আয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচই মেটানো কঠিন হয়ে উঠত। অনেক রাত না খেয়েই কাটাতে হয়েছে-কখনো নিজের জন্য, কখনো সন্তানের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে। সেই অন্ধকার সময়গুলো আজ যেন দূর অতীত। কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন রাজশাহীর দামকুড়া ইউনিয়নের ভিমের ডাইং এলাকার এই সংগ্রামী নারী।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে রাজশাহীর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে ‘কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে নিজের জীবনের সেই কষ্টগাঁথা তুলে ধরেন আফসানা মীম। ইউসেফ বাংলাদেশ আয়োজিত এ সেমিনারে ১০ জন সফল গ্র্যাজুয়েট ও উদ্যোক্তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যেই ছিলেন তিনি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে আফসানার। তিনি বলেন,“আমার মেয়েটার ছোট ছোট চাহিদা পূরণ করতে না পারলে বুকটা ভেঙে যেত। প্রাইভেট কারের ড্রাইভার স্বামীর আয়ে কোনো রকমে সংসার চলত। অনেক সময় মেয়ের জন্য দুধ কিনতেও কষ্ট হতো। তখন মনে হতো—এভাবে আর কতদিন?”
জীবনের এমন কঠিন বাস্তবতার মাঝেই ২০২৪ সালে ইউসেফ বাংলাদেশের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথা জানতে পারেন তিনি। পরে এসএমও (ঝগঙ) প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হয়ে নতুন এক যাত্রা শুরু করেন। সেখানে তিনি ড্রইং, কাটিং, সেলাই, অভারলক ও ফিনিশিংসহ গার্মেন্টস শিল্পের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন।
আফসানা বলেন,“প্রথমে ভয় লাগত, পারব তো? কিন্তু প্রশিক্ষকরা সাহস দিয়েছেন। ধীরে ধীরে শিখেছি, নিজেকে বদলাতে পেরেছি।”
প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মাল্টি লাইন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে সাধারণ অপারেটর হিসেবে চাকরি পান তিনি। বর্তমানে প্রতি মাসে ১৭ হাজার টাকা আয় করছেন। তিনি বলেন,“এখন আর মেয়ের চাহিদা অপূর্ণ থাকে না। নিজের হাতে উপার্জন করে সংসার চালাতে পারছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশিদ বলেন, “কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিকল্প নেই। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হলে এই খাতে আরও জোর দিতে হবে। রাজশাহী এখন সম্ভাবনাময় একটি শহর—এখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ইউসেফ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের নিয়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে তারা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে।”
সভাপতির বক্তব্যে ইউসেফ বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যান্ড ইনোভেশন্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, “দেশে অনেক শিক্ষিত বেকার রয়েছে। কিন্তু সঠিক দক্ষতা না থাকায় তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। ইউসেফ সেই জায়গায় কাজ করছে—প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজকে দক্ষ করে তুলছে।”তিনি জানান, প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। কৃষিভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে, যাতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউসেফ বাংলাদেশের রিজিওনাল ম্যানেজার শাহিনুর রহমান, বিভাগীয় শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আলমগীর কুমকুম এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন, সহকারী কমিশনার ভূমি মোহাম্মদ মেহেদী হাসান সহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। সেমিনার শেষে সফল গ্র্যাজুয়েট ও উদ্যোক্তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। আফসানা মীমের মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণীর জীবনে পরিবর্তনের আলো জ্বালাচ্ছে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে উঠে এসে নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ার এই গল্প যেন আজ অনেকের জন্যই এক নতুন আশার নাম।