বজ্রপাত প্রবণ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতিবছরই বাড়ছে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা
আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আর আমের মৌসুম এলেই ফলনের আনন্দের পাশাপাশি বাড়তে থাকে বজ্রপাতে প্রাণহানির শঙ্কা। দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ জেলা হিসেবে পরিচিত এই জেলায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন আমচাষি, কৃষক ও মৌসুমি শ্রমিকরা। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময় আমবাগান ও খোলা মাঠে অবস্থান করায় প্রতিবছরই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক সাধারণ মানুষ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। অতীতের বিভিন্ন বছরে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে পদ্মা নদীতে বরযাত্রীবাহী একটি নৌকায় বজ্রপাত হলে ১৭ জনের মৃত্যু হয়, যা জেলার ইতিহাসে একক বজ্রপাতে সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২২ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ জন। এর মধ্যে ৯ জনই আম সংগ্রহ কিংবা ঝড়ে পড়া আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছে। ৩ জুন সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের একটি আমবাগানে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় মিরাজ নামের এক কিশোরের। একই দিনে মারা যান পৌর এলাকার মনিরুল ইসলাম। পরদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় বজ্রপাতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ১৫ জুন শিবগঞ্জে আমবাগানে ফুটবল খেলার সময় একজনের মৃত্যু হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ জেলা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকা ও হিমালয়ের পাদদেশে সৃষ্টি হওয়া বজ্রমেঘ পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রাজশাহী অঞ্চলে প্রবেশ করে। স্থানীয় জলীয় বাষ্পের সঙ্গে মিলিত হয়ে এসব মেঘ আরও শক্তিশালী হওয়ায় এ অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ রয়েছে। মৌসুমজুড়ে হাজার হাজার কৃষক ও শ্রমিক আম সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তবে ঝড় শুরু হলেই অনেকেই ঝরে পড়া আম সংগ্রহের জন্য বাগানে ছুটে যান। এই প্রবণতাই প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ।
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার ২০২১-২২ অর্থবছরে জেলার পাঁচ উপজেলায় ১৬টি বজ্রনিরোধক মেশিন স্থাপন করে। প্রতিটি মেশিনে ব্যয় হয় প্রায় ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এসব যন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। জেলা পর্যায়ে এগুলো কতবার বজ্রপাত প্রতিরোধ করেছে বা বর্তমানে সচল রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও বিশেষজ্ঞের অভাবে নিয়মিত তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও সেই তথ্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিয়মিত পৌঁছায় না।
রাজশাহী আবহাওয়াবিদ মোঃ মানোয়ার হোসেন বলেন , বজ্রপাত সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে আগাম সতর্কবার্তা, জনসচেতনতা এবং নিরাপদ আচরণ অনুসরণ করলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বজ্রঝড় শুরু হলে আমবাগান, খোলা মাঠ, নদী বা জলাশয় থেকে দ্রুত নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়া উচিত। গাছের নিচে অবস্থান করা কিংবা ঝড়ে পড়া আম কুড়াতে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শাহিনুর আলম বলেন, বজ্রপাতে হতাহত কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম না থাকায় মানুষ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে সরে আসছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোঃ মুসা জঙ্গী বলেন, ঝড়ের সময় আম কুড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বহু পুরোনো। অনেকেই ঝড়ের মধ্যে বেশি আম পাওয়ার আশায় বাগানে ছুটে যান। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেন না, কয়েক কেজি আমের জন্য নিজের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। বজ্রপাতের সময় খোলা স্থানে অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিষয়টি জেলার পাঁচটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন করার ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া গণমাধ্যম কর্মীরা প্রচারের জন্য উপযুক্ত মাধ্যম। এছাড়া জেলার ফেসবুক ব্যাবহার কারীগন বজ্রপাতের কুফল সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচরণা করলে সাধারণ মানুষ অনেক সচেতন হবে।
স্থানীয় আমচাষি ও শ্রমজীবি গণমানুষের দাবি , মোবাইলে সময়মতো বজ্রপাতের সতর্কবার্তা পৌঁছানো, মৌসুমি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, বাগান এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হলে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
উল্লেখ্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঘনত্ব বাড়ছে। তাই শুধু বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন নয়, ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই হতে পারে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।