বিশ্বকাপ উন্মাদনায় শিশুরা, বোঝে না খেলা, বোঝে গোল
চারিদিকে ফুটবল বিশ্বকাপে উৎসবের আমেজ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুম সবখানেই এখন একটাই আলোচনা বিশ্বকাপ ফুটবল। প্রিয় দলের জার্সি, পতাকা আর তর্কের ঝড়ে মেতে আছেন বড়রা। কিন্তু এই তুমুল উন্মাদনার মাঝেও এক টুকরো স্বর্গীয় আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে বাড়ির খুদে সদস্যরা। তাদের ফুটবল প্রেম কোনো হিসেব-নিকেশের ধার ধারে না, সেখানে জড়িয়ে আছে কেবলই এক সরলতা। অফসাইড বোঝে না ওরা, বোঝে শুধু গোল।
ফুটবল বিশ্বকাপের এই যে বিশ্বজনীন উন্মাদনা, তা থেকে শিশুরাও পিছিয়ে নেই। বড়দের দেখাদেখি ওরাও এখন মেতে উঠেছে ফুটবল উৎসবে। বুঝে না বুঝে কোনো একটা দলের জার্সি গায়ে চাপানো, প্রিয় দলের গোলপোস্টে বল জড়ালেই শূন্যে লাফিয়ে ওঠা আর আকাশফাঁটা চিৎকার ব্যস, এটুকুই! ফুটবল বিশ্বকাপের এই মহোৎসবে ঘরের এই খুদে সদস্যরাও জড়িয়ে গেছে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাসে, ভালবাসায়। শিশুরা নিষ্কলুস সাপোর্টার।
এই খুদে ফুটবল ভক্তরা জানে না কোন দল পয়েন্ট টেবিলে এগিয়ে, কিংবা কবে, কখন, কার খেলা। অফসাইড বা ফাউলের জটিল নিয়মগুলো বোঝার বয়সও তাদের হয়নি। প্রিয় দলের সেরা তারকাটি কোন ক্লাবে খেলেন, সেই খবর রাখারও কোনো তাগিদ নেই তাদের। জার্সিটার রঙ হলুদ-নীল, নীল-সাদা, নাকি সাদা-কালো-এটুকুই তাদের চেনার পরিধি। এদের কাছে ফুটবলের একমাত্র ভাষা হলো গোল!
বড়দের ফুটবল উন্মাদনায় থাকে চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান আর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ। কিন্তু শিশুদের কাছে এই পুরো ব্যাপারটা কেবলই এক আনন্দের উৎসব। মাঠের ২২ জন খেলোয়াড় কেন একটা বলের পেছনে এভাবে ছুটছেন, তা নিয়ে ওদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। কিন্তু বলটা যখনই জালের ভেতরে জড়ায়, পুরো ঘর যখন বড়দের চিৎকারে কেঁপে ওঠে, তখন না বুঝেই দুই হাত তুলে লাফিয়ে ওঠে বাড়ির সবচেয়ে ছোট মানুষটিও। এই যে কোনো হিসাব ছাড়া, সমীকরণ ছাড়া উল্লাস-এটাই তো ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।
কাগজের তৈরি প্রিয়দলের পতাকা হাতে নিয়ে বাড়ির ছাদে, উঠানে বা ড্রয়িংরুমে খুদেদের যে দৌড়াদৌড়ি, তার চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী-ই বা হতে পারে! বাবা কিংবা বড় ভাই যে দলের সমর্থক, অবুঝ মন নিয়ে তারাও সেই দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বাবা আর্জেন্টিনা করেন তো ছেলে আর্জেন্টিনার সমর্থক, আবার মা ব্রাজিল সমর্থক হলে মেয়েও ব্রাজিলের। এই যে ভাগাভাগি, এই যে খুনসুটি-এর কোনোটিতে হিংসা নেই, আছে কেবলই বিশুদ্ধ আনন্দ।
বড়দের সমর্থনে যেখানে মাঝেমধ্যে মেজাজ হারানো, কাদা-ছোড়াছুড়ি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্কের ঝড় ওঠে, শিশুদের দুনিয়ায় সেসবের কোনো বালাই নেই। তাদের কাছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা জার্মানি কোনো চিরশত্রু দল নয়। তারা বোঝে কেবল জার্সির রঙ আর গোলপোস্টের ভেতরের আনন্দ। প্রিয় দল জিতলে তাদের মুখে ফোটে এক স্নিগ্ধ হাসি, আর হারলে হয়তো সামান্য মন খারাপ, একটু ঠোঁট উল্টে কান্না, যা এক বাটি আইসক্রিম বা একটা চকলেটের বিনিময়ে পরক্ষণেই মিলিয়ে যায়।
মাঝেমধ্যে দেখা যায়, টিভির পর্দায় কী হচ্ছে সেদিকে ওদের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। হয়তো ঘরের এক কোণে বসে পুতুল, গাড়ি নিয়ে খেলছে কিংবা ড্রয়িং খাতা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু যেই ঘরের বড়রা ‘গোল’ বলে চিৎকার দিল, অমনি সে-ও সব ফেলে এসে নাচতে শুরু করল। এ যেন এক অদ্ভুত সংক্রামক আনন্দ।
রাতের পর রাত জেগে যখন বড়রা টিভির পর্দায় চোখ রাখছেন, তখন অনেক শিশুই ঘুম জড়ানো চোখে আবদার করছে খেলা দেখার। হয়তো প্রথমার্ধ শেষ হতেই মায়ের কোলে মাথা রেখে ওরা ঘুমিয়ে পড়ছে, কিন্তু ঘুমানোর আগের ওইটুকুই তাদের কাছে পরম পাওয়া।
স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে এখন পড়াশোনার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে কে কত গোল দিল তা নিয়ে। স্কুলের বই-খাতার ফাঁকে উঁকি দেওয়া পেনসিল বক্স কিংবা জ্যামিতি বাক্সেও এখন সযত্নে শোভা পাচ্ছে প্রিয় তারকার রঙিন স্টিকার। বন্ধুদের সাথে জমানো খেলোয়াড়দের চকচকে কার্ডগুলোর লেনদেন চলে মহা উৎসাহে, যেন সেগুলোই তাদের ছোট্ট পৃথিবীর অমূল্য সম্পদ। আর নিজেদের শোবার ঘরের দেয়ালগুলোও এখন আর ফাঁকা নেই, সেখানে পরম মায়ায় জায়গা করে নিয়েছে প্রিয় দলের বড় বড় পোস্টার। খেলার জটিল নিয়মকানুন না বুঝলেও এভাবেই তারা নিজেদের চারপাশটা সাজিয়ে তুলেছে ফুটবলের আনন্দে। তাদের এই ছোট্ট, বর্ণিল আয়োজনগুলোই বলে দেয়, বিশ্বকাপের এই উৎসব তাদের নিষ্পাপ হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে।
ব্রাজিলের ক্ষুদ্র সমর্থক নুসাইবা রহমান (৪) বলেন, আমার সবচেয়ে প্রিয় রঙ তো হলুদ। ব্রাজিলের জামাটা একদম হলুদ রঙের, তাই আমি ব্রাজিল। মামা আমাকে একটা পুতুলের মতো সুন্দর জার্সি কিনে দিয়েছে। খেলার দিন আমি ওই জামাটা পরব, আর আম্মু বলেছে আমার নখে হলুদ রঙের নেইলপলিশ লাগিয়ে দেবে। তখন আমি হাততালি দিয়ে দিয়ে খেলা দেখব!
জার্মানির চঞ্চল সমর্থক আবির সৌরভ (৮) জানান, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চেয়ে জার্মানির কালো-সাদা আর সোনালী রঙের জার্সিটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লাগে। একদম সুপারহিরোদের মতো! বাবা আমাকে একটা লাল রঙের বাঁশি কিনে দিয়েছে। জার্মানি গোল দিলেই আমি জোরে জোরে বাঁশি বাজাব। আচ্ছা, জার্মানি যদি এবারও ৭টা গোল দেয়, তাহলে কি আমি ৭ বার বাঁশি বাজাতে পারব? আমি আগেই আম্মুকে বলে রেখেছি, বাঁশির শব্দে কিন্তু কান বন্ধ করা যাবে না।
আর্জেন্টিনার খুদে সমর্থক তাহমিদ আহমেদ (৭) বলেন, আমি আর আমার বাবা আমরা দুইজনই আর্জেন্টিনা। আমরা একদম সেম সেম (একই রকম) জার্সি আর বড় একটা পতাকা কিনেছি। আব্বু আমাকে সেলুনে নিয়ে গিয়ে মেসির ছবির মতো করে চুল কেটে দিয়েছে! মেসি যখন গোল দিয়ে ওপরে হাত তোলে, আমিও তখন টিভির সামনে মেসির মতো করে লাফাই।