মাথাওয়ালা সবচেয়ে প্রাচীন প্রাণীদের অধিকাংশই ‘ডানহাতি’!
পৃথিবীতে তখনও ডাইনোসর বা আমাদের পরিচিত কোনও প্রাণীর আবির্ভাব হয়নি। আজ থেকে প্রায় ৫৫ কোটি বছর আগের কথা। সেই সময়ে সমুদ্রের তলায় ঘুরে বেড়াত এরা। দেখতে অনেকটা চ্যাপ্টা কৃমির মতো। লম্বায় কয়েক সেন্টিমিটার। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে চলাচলের সময়ে এদের বেশির ভাগই ডান দিকে বেঁকে থাকত। গবেষকদের ধারণা, মাথাওয়ালা প্রাণীদের মধ্যে ‘ডানহাতি’ আচরণের এটিই সবচেয়ে প্রাচীনতম উদাহরণ।
কথা হচ্ছে ‘স্প্রিগিনা ফ্লাউন্ডারসি’ নামে এক বিলুপ্ত প্রাণীদের নিয়ে। এডিয়াকারান যুগে (আজ থেকে প্রায় ৫৪-৬৩ কোটি বছর আগের সময়কাল। জটিল বহুকোষী জীবের বিকাশ হয়েছিল এই যুগে) এদের আবির্ভাব হয় পৃথিবীতে। আনুমানিক ৫৫-৫৬ কোটি বছর আগে মহাসমুদ্রের তলদেশে ঘুরে বেড়াত স্রিগিনা। লম্বায় ২-৫ সেন্টিমিটার। কোনও কোনওটি ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্তও লম্বা হত। শরীরের সামনের দিকের অংশটি ঘোড়ার খুড়ের মতো। সেটি মাথা। পিছনের অংশটি সরু। এ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া মাথাওয়ালা প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এটিই।
বিলুপ্ত এই প্রাণীর একদা অস্তিত্বের কথা প্রথম জানা যায় আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে। ১৯৫৮ সালে পাওয়া যায় এদের প্রথম জীবাশ্ম। কিন্তু এরা নিজে থেকে চলাচল করতে পারত কি না, তা সেই সময় স্পষ্ট ছিল না। তার পরে বিগত দশকগুলিতে এদের জীবাশ্ম নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। জানা গিয়েছে, এরা চলাচল করতে পারত। এ বার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেল, এরা যে শুধু চলাচল করতে পারত তা-ই নয়, চলাচলের সময়ে ডান দিককে বেশি প্রাধান্য দিত এরা। চলতি মাসেই ‘সায়েন্টেফিক রিপোট্র্স’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
আমেরিকান মিউজ়িয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রির জীবাশ্মবিদ স্কট ইভান্স এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। স্প্রিগিনার ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত শতাধিক জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখেন ইভান্স এবং তাঁর সহযোগীরা। তাতে দেখা যায়, কিছু জীবাশ্মের দেহ সোজা ছিল। তবে বেশির ভাগেরই জীবাশ্ম বাঁ দিকে বাঁকানো ছিল। এই জীবাশ্মগুলি আসলে প্রাণীদেহের প্রতিবিম্বিত ছাপ। যা থেকে বোঝা যায়, জীবদ্দশায় স্প্রিগিনাগুলির দেহ ডান দিকে বাঁকানো ছিল।
গবেষকদের ধারণা, পৃথিবীর প্রাচীনতম মাথাওয়ালা জীবদের মধ্যে এই ডান দিকে বেঁকে থাকার প্রবণতা আসলে একটি আচরণগত পছন্দ। যেমনটা বর্তমানেও বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়। মানুষের মধ্যে যেমন এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তেমনই অন্য প্রাইমেটের মধ্যেও রয়েছে। ইঁদুর, ব্যাঙ এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বর্তমান পৃথিবীতে স্প্রিগিনার মতো হুবহু কোনও প্রাণী নেই। তবে প্রাণীদের দিক পছন্দের ক্ষেত্রে বিবর্তনের ভিত্তি নিয়ে পরবর্তী গবেষণায় স্প্রিগিনার এই আচরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আজ থেকে ৫৫ কোটি বছর আগের কোনও প্রাণীর মধ্যেও যে আচরণগত পছন্দের এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, তা দেখে বিস্মিত জীবাশ্মবিদেরাও। গবেষকদলের প্রধান ইভান্সের কথায়, “এই আদিম প্রাণীর জীবাশ্মগুলি বেশির ভাগ মানুষের কাছে, এমনকি আমার কাছেও বেশ অদ্ভুত। কিন্তু এই অদ্ভুত ভাবটা বাদ দিলে দেখা যাবে— আজকের প্রাণীদের মধ্যে যে সব মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে— যেমন নড়াচড়া করার ক্ষমতা, আচরণের ক্ষেত্রে ডান-বামহাতি হওয়ার প্রবণতা, সেগুলো এই আদিম প্রাণীদের মধ্যেও ছিল।”
স্প্রিগিনা ছিল সামুদ্রিক প্রাণী। ফলে মৃত্যুর পরে জলের স্রোতে তাদের শরীরে বেঁকে গিয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার ছিল। তা ছাড়া মৃত্যুর পরে দেহ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে তা বেঁকে গিয়েছে কি না, তা নিয়েও সংশয় ছিল। তাই জীবাশ্মগুলিকে আরও বিশ্লেষণ করে দেখেন ইভান্স এবং তাঁর সহযোগীরা। তবে স্প্রিগিনাগুলির শরীরের বাঁকে একটির সঙ্গে অপরটির কোনও সামঞ্জস্য ছিল না, যা থেকে গবেষকেরা নিশ্চিত হন যে, জলের স্রোতে বা দেহ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে ডান দিকের ওই বাঁকগুলি তৈরি হয়নি। সমুদ্রতলে জীবিত অবস্থায় চলাফেরার সময়েই সেগুলি তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন