শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

সচ্ছল পরিবারেও ৪২ শতাংষ বাল্যবিয়ে

সোনার দেশ ১৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৪ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ১৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৪ অপরাহ্ন
সচ্ছল পরিবারেও ৪২ শতাংষ বাল্যবিয়ে

আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ গড়তে হবে 

দেশে বাল্যবিয়ে একটি জাতীয় সমস্যা। বাল্যবিয়ে বহুবিধ সামাজিক সমস্যা তৈরি করে। এর ফলে নারীর অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। বাল্যবিয়ের জন্য পরিবারের আর্থিক দৈন্যতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করা হয়। কিন্তুবর্তমান সময়ে বিষয়টি তেমনটি নয়। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিয়ের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। শুধু আর্থিক কারণে বাল্যবিয়ের প্রবণতা সমাজে বিদ্যমান- এ কথা বলার আর সুযোগ নেই।  

জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশেরই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রবণতা কেবল দরিদ্র পরিবারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের সবচেয়ে সচ্ছল ও ধনী পরিবারগুলোর মধ্যেও ৪২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক কিশোরীর শিক্ষাজীবন মাঝপথে থেমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে কিশোরী মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই তথ্য এই সাক্ষ্য দেয় যে,  দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও বাল্যবিয়ে রোধে কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি। অথচ একইসাথে এ ক্ষেত্রেও অগ্রগতিটা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল।  

জরিপে পরিবারের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার ৬৫ শতাংশ। তবে শুধু দরিদ্র পরিবারেই নয়, সবচেয়ে সচ্ছল পরিবারের মধ্যেও ৪২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। জরিপে তথ্যমতে, বাল্যবিয়ের হার কিছুটা কমলেও কিশোরী বয়সে সন্তান জন্মদানের হার বেড়েছে। ২০১৯ সালে প্রতি এক হাজার ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীর মধ্যে জীবিত সন্তান জন্মদানের হার ছিল ৮৩। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২-এ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতে, বর্তমান গতিতে বাল্যবিয়ের হার কমতে থাকলে বাংলাদেশে এ প্রথা পুরোপুরি বন্ধ হতে আরো ২০০ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে- সরকার বাল্যবিয়ে রোধে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৮-২০৩০) অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুর বিয়ে নির্মূল এবং ১৮ বছরের কম বয়সী কন্যাশিশুর বিয়ে এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার কথা থাকলেও বর্তমান অগ্রগতির যে ধারা তাতে অসম্ভব বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বাল্য বিয়ে বন্ধে করণীয় উপায়গুলো আমাদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই নিহিত আছে। এর একটি বাদ দিয়ে অন্যটিকে সুসংহত করা যাবে না। শুধু আইনের মধ্যেই এর সমাধান খোঁজা ঠিক হবে না। সাধারণ্যে সচেতনতা সৃষ্টি একটি গুরুত্বপর্ণ পর্যায় বটে। কিন্তু সচেতন বোধ ও এর ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য অবশ্যই সক্ষমতার প্রয়োজন আছে। এই সক্ষমতা- আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়েই বাল্যবিয়ে প্রবণতার অবসান ঘটাতে পারে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জাতীয় সংহতি সৃষ্টির উপায়গুলো বিবেচনায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।