সূর্যের থেকে বাসযোগ্য দূরত্বের গ্রহে বায়ুমণ্ডল! আমাদের সৌরজগতের বাইরে এই প্রথম পেলেন বিজ্ঞানীরা
পৃথিবীর চেয়ে অনেক শীতল। তবে আকারে বড়। ভরও পৃথিবীর চেয়ে বেশি। ভিন্গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার জন্য মূল যে বৈশিষ্ট্যগুলি দরকার— দাবি করা হচ্ছে তার সবের জন্যই অনুকূল পরিবেশ রয়েছে এখানে।
কোনও গ্রহ বসবাসের উপযোগী কি না, তা বিবেচনা করার জন্য তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যের উপর গুরুত্ব দেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমত, সেটি পাথুরে গ্রহ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলের (তরল অবস্থায়) অস্তিত্বের জন্য সঠিক তাপমাত্রা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, বায়ুমণ্ডল থাকতে হবে। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই রয়েছে ‘এলএইচএস ১১৪০বি’-তে।
তা হলে সেখানে কি প্রাণের সন্ধান মিলল? উত্তর হল, না। ওই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ এই মুহূর্তে নেই বিজ্ঞানীদের কাছে। তবে এমন কিছুর সন্ধান মিলেছে, যার জন্য বছরের পর বছর ধরে খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মিলেছে বায়ুমণ্ডল।
আমাদের সৌরজগতের বাইরে এই প্রথম কোনও নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জ়োনের’ গ্রহে বায়ুমণ্ডল পাওয়া গেল। ‘হ্যাবিটেবল জ়োন’ বলতে বোঝায় কোনও নক্ষত্রের চারপাশের একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব, যা বাসযোগ্য হতে পারে— যেখানে গ্রহগুলি খুব গরমও নয়, খুব শীতলও নয়। যে দূরত্ব গ্রহের পৃষ্ঠে তরল অবস্থায় জল থাকার জন্য উপযুক্ত। ‘এলএইচএস ১১৪০বি’-ও নিজের নক্ষত্রের থেকে এমন একটি মানানসই দূরত্বে রয়েছে।
‘এলএইচএস ১১৪০বি’ আবিষ্কার হয় ২০১৭ সালে। পৃথিবী থেকে ৪৮ আলোকবর্ষ (আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। এক বছরে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকেই বলে আলোকবর্ষ। এক আলোকবর্ষ ৯.৫ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের সমান) দূরের এক গ্রহ। আমাদের সৌরমণ্ডল যে ‘মিল্কি ওয়ে’ ছায়াপথে রয়েছে, এ-ও রয়েছে সেই একই ছায়াপথে। ব্যাসার্ধ পৃথিবীর ১.৭৩ গুণ। অর্থাৎ, আয়তনে প্রায় পাঁচ গুণ। প্রদক্ষিণ করে এক লালচে বামন নক্ষত্রকে। এই নক্ষত্র আমাদের সূর্যের চেয়ে অনেক ছোট এবং শীতল।
আমাদের ছায়াপথে এমন লালচে বামন নক্ষত্র আরও অনেক রয়েছে। এই নক্ষত্রগুলি তুলনায় ছোট এবং শীতল হওয়ার ফলে এদের চারপাশের পাথুরে গ্রহগুলিকে সহজে শনাক্ত করা যায়। অতীতে নিজ নিজ নক্ষত্রের থেকে বাসযোগ্য দূরত্বে প্রদক্ষিণ করা শ’য়ে শ’য়ে গ্রহের সন্ধান মিলেছে। তবে পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি এবং পাথুরে— এমন গ্রহ মাত্র কয়েক ডজনই পাওয়া গিয়েছে। তা-ও সেগুলির কোনওটিতেই এত দিন পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলের সন্ধান মেলেনি। এ বার সেই বায়ুমণ্ডলের খোঁজ মিলল।
আবিষ্কার হওয়ার পর গত কয়েক বছরে বিস্তর গবেষণা চলে ‘এলএইচএস ১১৪০বি’ নিয়ে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কলিন চেরুবিন এবং তাঁর সহযোগীরা সম্প্রতি এই গ্রহে বায়ুমণ্ডল আবিষ্কার করেছেন। চলতি সপ্তাহে ‘সায়েন্স’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। আবিষ্কারের পরে বেশ উচ্ছ্বসিত চেরুবিন। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের কাছে এই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্বের কোনও প্রমাণই নেই। কিন্তু আমরা মনে করি, এর জন্য (প্রাণের অস্তিত্বের জন্য) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য সব উপাদানই সেখানে রয়েছে।”
বিজ্ঞানীদের মতে, কোনও গ্রহ বাসযোগ্য হওয়ার জন্য সেখানে বায়ুমণ্ডল থাকা অবশ্যই দরকার। কারণ, বায়ুমণ্ডলই সেই গ্রহকে জল ধরে রাখতে সাহায্য করবে। জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করবে। মহাজাগতিক বিকিরণ থেকেও গ্রহকে রক্ষা করবে বায়ুমণ্ডলই। এর আগে বিভিন্ন বড় আকারের গ্যাসীয় গ্রহগুলিতে বায়ুমণ্ডলের সন্ধান মিলেছে। তবে ছোট আকারের, পাথুরে গ্রহতেও বায়ুমণ্ডল থাকতে পারে কি না— তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা ছিল না বিজ্ঞানীদের কাছে। এ বার সেই ধোঁয়াশা কাটল।
তবে এই গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এখনও পর্যন্ত শুধু হিলিয়াম গ্যাসই পাওয়া গিয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে সেটি বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে রয়েছে। এই গ্যাস নিজে থেকে কোনও প্রাণের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। তবে বিজ্ঞানীদের অনুমান, বায়ুমণ্ডলের ভিতরের স্তরে অন্য গ্যাসও থাকতে পারে। জীবন ধারণের উপযোগী কোনও গ্যাসও কি থাকতে পারে? তা নিয়ে আরও বিশদে গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন চেরুবিন এবং তাঁর সহযোগীরা।
চেরুবিনেরা এই গ্রহটিকে অনেকক্ষেত্রে পৃথিবীর সমতুল বলে ব্যাখ্যা করছেন। যেমন উভয়েই পাথুরে গ্রহ। উভয়েই নিজ নক্ষত্র থেকে একটি ‘মানানসই’ দূরত্বে রয়েছে। উভয়েরই বায়ুমণ্ডলও আছে। তবে পৃথিবীর চেয়ে কিছু ক্ষেত্রে ফারাকও রয়েছে এই গ্রহের। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ৩৬৫ দিন। অন্য দিকে ‘এলএইচএস ১১৪০বি’ নিজ নক্ষত্রের চার পাশে এক বার পাক খায় ২৫ দিনেরও কম সময়ে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশি রয়েছে নাইট্রোজেন গ্যাস। তবে ‘এলএইচএস ১১৪০বি’-তে এ পর্যন্ত শুধু হিলিয়াম গ্যাসই শনাক্ত করা গিয়েছে।
‘এলএইচএস ১১৪০বি’-তে বায়ুমণ্ডলের আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। এমআইটি-র জ্যোতির্পদার্থবিদ সারা সিগার (তিনি এই গবেষণার সঙ্গে জড়িত নন) এই আবিষ্কারকে আশাব্যঞ্জক বলে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁর মতে, একটি গ্রহতে এমন বায়ুমণ্ডল পাওয়া গিয়েছে মানে সমতুল অন্য গ্রহগুলিতেও তা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আবিষ্কার ‘নতুন কিছুর সূচনা’ করল বলে মনে করছেন তিনি।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন