শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

কেন মেসি নয় রদ্রিই বিশ্বকাপের সেরা

সোনার দেশ ডেস্ক ২০ জুলাই ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন বিশ্বকাপ
সোনার দেশ ডেস্ক ২০ জুলাই ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন
কেন মেসি নয় রদ্রিই বিশ্বকাপের সেরা

বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল একটাই। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল কি লিওনেল মেসির হাতে যাওয়া উচিত ছিল, নাকি রদ্রির? ফিফার সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট। পুরস্কার উঠেছে স্পেন অধিনায়ক রদ্রির হাতে। আর ফাইনালের ১২০ মিনিট যেন সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাখ্যা হয়ে দাঁড়ায়।

স্পেন শুধু আর্জেন্টিনাকে হারায়নি। তারা এমনভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে, যেখানে লিওনেল মেসি নিজের প্রভাবই বিস্তার করতে পারেননি। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতলেও ম্যাচের চিত্র ছিল অনেক বেশি একপেশে।

পুরো ম্যাচে স্পেন প্রথম ২০টি শট নিয়েছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার প্রথম শট আসে ১১৭তম মিনিটে। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ বিশ্বকাপ ফাইনালের রেকর্ড ১২টি সেভ না করলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যা বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

এই অসাধারণ সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন একজনই, রদ্রি। ফাইনালের পর ট্রফি হাতে তোলার কয়েক মুহূর্ত আগে গোল্ডেন বলও ওঠে তাঁর হাতে। ফিফা তাঁকে আখ্যা দেয়, স্পেনের মাঝমাঠের ‘অতুলনীয় নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে।

অনেকে মেসির আট গোল ও চার অ্যাসিস্টের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। পরিসংখ্যান বলছে, গ্রুপ পর্বে ছয় গোল করার পর নকআউটে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষেও গোল করেন তিনি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুই গোলই আসে তাঁর তৈরি করা সুযোগ থেকে। কিন্তু গোল্ডেন বল গোলদাতার পুরস্কার নয়। এটি টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি।

মেসির দায়িত্ব ছিল গোল করা ও সুযোগ তৈরি করা। রদ্রির কাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল ধরে রাখা, আক্রমণ গড়ে তোলা, প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ থামানো, প্রেসিং পরিচালনা এবং পুরো দলের ভারসাম্য বজায় রাখা। এই দুই ভূমিকার তুলনা শুধু গোল কিংবা অ্যাসিস্ট দিয়ে করা যায় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টুর্নামেন্টের শেষভাগে মেসির গোলের ধারা থেমে যায়। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনাল, কোনো ম্যাচেই তিনি গোল করতে পারেননি। স্পেন এমনভাবে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছে যে বিপজ্জনক এলাকায় মেসির কাছে বলই পৌঁছাতে পারেনি।

সেখানেই রদ্রি হয়ে ওঠেন ম্যাচের আসল নিয়ন্ত্রক। ফাইনালের আগে তিনি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৬৪৮টি সফল পাস সম্পন্ন করেছিলেন, যার সফলতার হার ছিল ৯৩ শতাংশ। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ৮৩ হাজার ৮০২ মিটার দৌড়েছেন তিনিই। সর্বোচ্চ উচ্চগতির রানও ছিল তাঁর ঝুলিতে। এসব পরিসংখ্যান শুধু পরিশ্রমের নয়, পুরো দলের খেলাকে নিজের চারপাশে গড়ে তোলারও প্রমাণ।

রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল, স্পেনের ফুটবলকে টেকসই করে তোলা। প্রতিপক্ষের চাপ ভেঙে প্রথম পাস দেওয়া, আক্রমণের দিক নির্ধারণ করা, ফুলব্যাকদের ওপরে ওঠার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আক্রমণভাগকে স্বাধীনতা দেওয়া এবং একই সঙ্গে ডিফেন্সকে সুরক্ষা দেওয়া, সবকিছুই করছিলেন তিনি।

ফলে স্পেনের বিপক্ষে সুযোগ তৈরি করতে হলে প্রতিপক্ষকে প্রথমে বল কেড়ে নিতে হয়েছে, তারপর রদ্রিকে পেরোতে হয়েছে, এরপর গুছিয়ে থাকা রক্ষণভাগ ভাঙতে হয়েছে। পুরো বিশ্বকাপে প্রায় কোনো দলই সেই কাজ করতে পারেনি।

পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, সবাইকে একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে স্পেন। এরপর ফাইনালে আসে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণভাগ নিয়ে খেলা আর্জেন্টিনা। ফাইনালের আগে ১৯ গোল করা দলটি স্পেনের বিপক্ষে কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

ফাইনালে রদ্রি ১০৬টি পাসের মধ্যে ১০১টিই সফল করেন। আর্জেন্টিনার অর্ধে সফল পাস দেন ৬১টির মধ্যে ৫৭টি। দীর্ঘ পাসে সফল হন ৯টির মধ্যে ৮টিতে। তৈরি করেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, জেতেন আটটি দ্বৈরথ।

তিনি শুধু বল নিজের কাছে রাখেননি, সেই বল দিয়েই আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে আটকে রেখেছেন এবং মেসিকে ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছেন। এটাই রদ্রি ও মেসির পার্থক্য। মেসির পরিসংখ্যান চোখে পড়ে। রদ্রির প্রভাব পুরো ম্যাচের ভেতরে ছড়িয়ে থাকে।

ফাইনালে যখন টুর্নামেন্টের দুই প্রধান গোল্ডেন বল দাবিদার মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তখন রদ্রি নিজের কাজ নিখুঁতভাবে করেছেন। আর মেসিকে তাঁর কাজটাই করতে দেননি। অনেকে বলেন, একটি ম্যাচ দেখে পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্ধারণ করা যায় না। কথাটি ঠিক। তবে ফাইনালও আর পাঁচটি ম্যাচের মতো নয়। বিশেষ করে যখন দুই প্রধান দাবিদার একই মাঠে একে অপরের বিপক্ষে খেলেন।

রদ্রি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ছিলেন স্পেনের খেলার কেন্দ্রবিন্দু। আর ফাইনালে সেই দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছেন। অন্যদিকে মেসি টুর্নামেন্টে দারুণ পরিসংখ্যান গড়লেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করতে পারেননি, অ্যাসিস্ট করতে পারেননি, এমনকি আর্জেন্টিনার প্রথম শটই আসে অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ দিকে।

গোল্ডেন বল কোনো আজীবন সম্মাননা নয়। এটি একটি নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টে সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারের পুরস্কার। সেই বিচারে রদ্রি শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কই নন, তিনি ছিলেন স্পেনের বল দখল, রক্ষণ, ছন্দ এবং সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু।

মেসি হয়তো শিরোনাম কেড়েছেন তাঁর গোল দিয়ে। কিন্তু পুরো বিশ্বকাপের গল্প লিখেছেন রদ্রি, নিজের নীরব অথচ সর্বগ্রাসী আধিপত্য দিয়ে। তাই গোল্ডেন বল তাঁর হাতেই ওঠা শুধু যৌক্তিক নয়, বরং সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি