চাঁদের ‘কলঙ্ক’ কী থেকে তৈরি? চিনের মহাকাশযানে আসা পাথর ঘেঁটে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা!
চাঁদের ‘কলঙ্কে’ রোমাঞ্চিত হয়ে বার বার কলম ধরেছেন কবিরা। কিন্তু বাস্তবের রোমাঞ্চে যে কোনও ‘কলঙ্ক’ নেই, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান। পৃথিবী থেকে চাঁদের গায়ে যে অজস্র ছোটবড় কালো দাগ দেখা যায়, তা আসলে বিশাল এক-একটা গর্ত। চাঁদে গিয়ে মানুষ তা যাচাই করে এসেছে। এই সমস্ত গর্ত, খাদ এবং প্রকাণ্ড অববাহিকা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহল দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি চিনের এক গবেষণা এ বিষয়ে প্রচলিত ধারণা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তাদের নতুন তত্ত্ব যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তা হলে বদলে যেতে পারে আমাদের এত দিনের জানা চন্দ্র-ইতিহাস!
পৃথিবী যেমন নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, চাঁদও তেমন নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হিসেব খানিক আলাদা। চাঁদ নিজের অক্ষের চারপাশে ঘুরতে যত সময় নেয়, পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে ঠিক ততটাই সময় নেয়। এর ফলে চাঁদের একটি দিক স্থায়ী ভাবে পৃথিবীর চোখের আড়ালে থেকে যায়। পৃথিবী থেকে দেখা যায় কেবল একটি গোলার্ধ। বিজ্ঞানীদের যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষাও এত দিন হয়েছে তুলনামূলক কাছের দৃশ্যমান সেই গোলার্ধ নিয়ে। অন্য গোলার্ধটি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গিয়েছে দীর্ঘদিন।
চাঁদের এই দূরবর্তী গোলার্ধ থেকে প্রথম নমুনা পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছিল চিন। ২০২৪ সালে তাদের চ্যাং-৬ মহাকাশযান সেখান থেকে মাটি এবং পাথরের নমুনা তুলে আনে পৃথিবীতে। সে সব নিয়ে বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। সম্প্রতি চিনের গুয়াংঝৌ ইনস্টিটিউট অফ জিয়োকেমিস্ট্রির অধ্যাপক ওয়ানফেং ঝ্যাংয়ের নেতৃত্বে একটি গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়। চাঁদের গর্ত এবং অববাহিকাগুলির ইতিহাস নিয়ে সেখানেই নতুন তত্ত্ব উঠে এসেছে।
চাঁদের সঙ্গে অতীতে কখনও বিরাট কোনও মহাজাগতিক বস্তু বা পাথরখণ্ডের সংঘর্ষ হয়েছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। গর্ত ও খাদগুলি তার ফলেই তৈরি হয়েছে। এত দিন পর্যন্ত যা তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তাতে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ৩৯০ কোটি বছর আগে কোনও এক সময়ে মহাজাগতিক পাথরখণ্ড আছড়ে পড়েছিল চাঁদে। বহুদিন পর্যন্ত তার প্রভাব ছিল। এই পর্যায়কে ‘লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট’ বলা হয়। চিনের গবেষণায় সেই ধারণাই বদলাতে চলেছে। চ্যাং-৬-এর বয়ে আনা নমুনায় আরও পুরনো পাথরখণ্ডের হদিস পাওয়া গিয়েছে। চাঁদের গর্ত ও অববাহিকাগুলির অধিকাংশই কোনও একটি স্বল্পস্থায়ী সংঘর্ষ-পর্বে তৈরি হয়নি— এই গবেষণা এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বরং আরও প্রাচীন সময় থেকে চাঁদের সঙ্গে মহাজাগতিক সংঘর্ষ হয়ে আসছে। এই ইতিহাস আকস্মিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
ওয়ানফেং এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘চাঁদের দূরের গোলার্ধে সংঘর্ষের ঘটনাগুলির নেপথ্যে কোনও একটি বিপর্যয়ের প্রাধান্য ছিল না। বরং, দীর্ঘ সময় ধরে চাঁদ তুলনামূলক কম শক্তিশালী বহু আঘাত পেয়ে এসেছে।’’ ওয়ানফেংরা চাঁদ থেকে তুলে আনা ২৮টি পাথরখণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। অতীতের কোনও সংঘর্ষের প্রভাবে সেগুলি একসময় প্রচণ্ড উত্তাপে গলে গিয়েছিল। তার পর ধীরে ধীরে আবার ঠান্ডা হয়েছে। বিশেষ পদ্ধতিতে এই সমস্ত পাথরের গলনের সময় নির্ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। দেখা গিয়েছে, পাথরগুলির বয়স ১১৩ কোটি থেকে ৪৩৩ কোটি বছরের মধ্যে। দু’টি পাথরখণ্ড সবচেয়ে পুরনো, প্রায় ৪৩৩ কোটি বছরের। চাঁদের দূরবর্তী গোলার্ধের নমুনায় এত প্রাচীন অভিঘাতজনিত গলিত শিলার বয়স আগে জানা ছিল না।
চিনের আগে আমেরিকা এবং রাশিয়া চাঁদে মহাকাশযান পাঠিয়েছে। প্রতি ক্ষেত্রেই নিকটবর্তী গোলার্ধে অভিযান হয়েছিল। তার ভিত্তিতে ‘লেট হেভি বম্বার্ডমেন্ট’ বা এলএইচবি তত্ত্বের ধারণা জোরালো হয়েছিল। ফলে তার বাইরে অন্য অংশের মাটিতে কী নমুনা রয়েছে, দেখার সুযোগ এত দিন পাননি বিজ্ঞানীরা। কৌতূহলের বিষয় হল, চাঁদের এই ইতিহাসের সঙ্গে কিন্তু পৃথিবী এবং সৌরজগতের ইতিহাসও জুড়ে রয়েছে। তাই আমেরিকা এবং রাশিয়ান অভিযান থেকে প্রাপ্ত তত্ত্বের সত্যতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। এত দিনে তার বিপরীত একটি তত্ত্ব পাওয়া গেল। ওয়ানফেংয়ের কথায়, ‘‘চাঁদের উপর মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষের ইতিহাস সম্পর্কে আমরা অনেকটাই ধোঁয়াশায়। দূরবর্তী গোলার্ধের পাথরগুলি বিশ্লেষণ করেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।’’
তবে চিনা বিজ্ঞানীদের তত্ত্বটি নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, দূরের গোলার্ধের কেবলমাত্র একটি অংশের পাথরের নমুনা থেকে সম্পূর্ণ চাঁদের ইতিহাস কল্পনা করে নেওয়া উচিত হবে না। ওই সমস্ত পাথর কোনও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলেও চন্দ্রপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। সেই কারণে হয়তো প্রথমে তা গলিত অবস্থায় ছিল এবং পরে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়েছে। সব ধরনের সম্ভাবনা নিয়েই বিশদে গবেষণা প্রয়োজন, দাবি বিজ্ঞানীদের।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন