গুরুদাসপুরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-উদাসীনতায় বিভ্রান্ত ইউএনও
নাটোরের গুরুদাসপুরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনিয়ম ও উদাসীনতা সবার সামনে তুলে ধরলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ। এবারের এসএসসির ফলাফলে উপজেলায় শিক্ষা ব্যবস্থার দূরাবস্থার কারণে শিক্ষকদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন তিনি।
সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ চত্বরে শিক্ষার মানোন্নয়নে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যকালে উপজেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের সামনেই নানা অনিয়মের সমালোচনা করেন ইউএনও। সভার প্রধান অতিথি মো. আব্দুল আজিজ এমপির বরাত দিয়ে বক্তব্যের প্রথমেই শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি ক্ষোভ-দুঃখ প্রকাশ করেন ইউএনও ফাহমিদা আফরোজ।
তিনি বলেন- ‘পাইলট স্কুলের ৩৯ শিক্ষার্থী বলেছে, তাদেরকে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। নাহলে নাম্বার দেওয়া হয় না। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণির ছাত্রদের হাতে মোবাইল আসক্তি দেখে অবাক হলাম। তারা দেড়লাখ টাকার মোবাইল ব্যবহার করে। আমার মতো ইউএনও’রও সেই সামর্থ্য নেই। শিক্ষক পরিবারের সন্তানদেরই এ অবস্থা। স্কুল পড়ুয়া সন্তানকে মারার জন্য মোটরসাইকেল কিনে দিচ্ছেন। অভিভাবকদের এমন উদাসীনতায় ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন- ‘শিক্ষকরা সময়মতো স্কুলে হাজির না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বাইরে ঘুরে বেড়ায়। একদিন চাঁচকৈড় নাজিম উদ্দিন স্কুল, রোকেয়া স্কুল, পুরুলিয়া স্কুলসহ চারজন প্রধান শিক্ষককে ফোন দিয়ে জানতে পারি- তারা কেউ অসুস্থ, কেউ নাটোরে আছেন। কোনো না কোনো কারণে তারা প্রতিষ্ঠানে নেই। স্কুলে শিক্ষার্থীর হাজিরা থাকলেও অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীর সাথে চলে যায়। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমি কাকে ধরতাম। শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে গেলে সেটার দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের।’
স্কুল পরিদর্শনে ইউএনও বলেন- পৌর সদরের শহীদ মোবিদুল হাইস্কুল থেকে আমাকে ৪২ জন ছাত্রের তথ্য দেয়া হয়। কিন্তু শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দেখি মাত্র ২ জন ছাত্র উপস্থিত আছে। ৮ম শ্রেনিতে শিক্ষক আর্টিকেল পড়াচ্ছিলেন। কিন্তু আর্টিকেল বানান জানেন না ওই শিক্ষক। পাঁচবার চেষ্টা করেও পারেন নাই। এমনকি ওই স্কুলের কোনো শিক্ষকই পারেননি। এই দায়টা কার? শিক্ষকরা যে বিষয়ে পড়াবেন সেই বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা বাধ্যতামুলক। সহজভাবে উপস্থাপন করে শিক্ষার্থীদের বুঝাতে হবে।
তিনি আরও বলেন- নূর মোহাম্মদ টেকনিক্যাল স্কুলেও দুইজন শিক্ষার্থী ছিলো। কিন্তু কোনো শিক্ষক পাইনি। আমি সাবমার্চেবল না দিয়ে ফিরে আসি। আবার শিধুলী হাইস্কুলে মামলা মকদ্দমার জটিলতা চলছে। সেখানে স্টুডেন্টদের নির্দিষ্ট গাইড পড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে। বৃপাথুরিয়া হাইস্কুলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ দিয়েছে।
কনফিউজড হয়ে ইউএনও বলেন- গত বৃহস্পতিবার রোজী মোজাম্মেল মহিলা কলেজ, বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা কলেজ, খুবজীপুর হাইস্কুলের ব্যাপারে আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। আপনারাও হয়তো বিষয়গুলো জানেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে সেটা নিয়ে আমি কনফিউজড।
তবে সম্ভাবনাময়ী মনে করে ইউএনও বলেন- নাজিরপুর সম্ভাবনাময়ী হলেও শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে। শুধু তাই না, কাছিকাটা স্কুল এন্ড কলেজ ও ঝাউপাড়ায় মারামারির উপক্রম হয়েছে। স্কুলের ভিতরে শিক্ষকদের রুমে হাতুরি দিয়ে মারামারি হয়। এর চেয়ে ভয়ংকর আর কী আছে?
শনিবার (২২ আগস্ট) উপজেলা শিক্ষক সমিতি কর্তৃক আয়োজিত দিনব্যাপী এ মতবিনিময় সভায় প্রায় ৭শ’ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। ইউএনও’র এই কঠোর বক্তব্য শিক্ষকদের মাঝে সচেতনতা ও আলোচনার সৃষ্টি করে। যেন দীর্ঘদিনের জমানো অনিয়ম ও অভিযোগের ক্ষোভ শিক্ষকদের ওপর ঝাড়লেন ইউএনও ফাহমিদা আফরোজ।
সভায় প্রধান অতিথি আব্দুল আজিজ এমপি ছাড়াও বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জেলা শিক্ষা অফিসার রুস্তম আলী হেলালী, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সেলিম আকতার, ওসি আব্দুল হান্নান, অধ্যক্ষ লিপি রাণী সরকার, লুৎফর রহমান, মাসুদুল হক আলেক, আব্দুল মজিদ, হারুনুর রশীদ, আনিসুর রহমান, ওসমান গণী, শিক্ষক জহুরুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান রান্টু, সাংবাদিক আলী আক্কাছ, আয়নাল হক প্রমূখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন প্রধান শিক্ষক নিগার সুলতানা ও শিক্ষক মিজানুর রহমান। ২য় পর্বে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।