সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

রংপুরে ৪ খুন: সেই রাতে কোথায় ছিলেন অভিযুক্তরা- যা বললেন সিদ্ধার্থের বাবা ও মুগ্ধর মা

সোনার দেশ ডেস্ক ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:২০ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১০:২০ অপরাহ্ন
রংপুরে ৪ খুন: সেই রাতে কোথায় ছিলেন অভিযুক্তরা- যা বললেন সিদ্ধার্থের বাবা ও মুগ্ধর মা

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস খুনের রাতে নিজেদের বাড়িতে ছিলেন না। পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ফুটবল খেলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। মুগ্ধও রাতে বাড়িতে ছিলেন না। তবে পুলিশ বলছে, ওই রাতে তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করেছিলেন। খুনের পর সেখানেই অবস্থান করেন। এখন আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধর পরিবারের সদস্যরা।


গত শনিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের সময় প্রতিবেশী সিদ্ধার্থকে তাঁর চাচার বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। একই সময় মুগ্ধর বাড়িতে গেলে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। পরে শ্মশান এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।


সোমবার সকাল ১০টার দিকে মাছুয়াপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সামনে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পুরো এলাকায় থমথমে পরিবেশ, চাপা উত্তেজনা।


সিদ্ধার্থের বাড়িতে কথা হয় তাঁর মা পাপড়ী রানীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সে বলেছিল, ফুটবল খেলতে যাবে। রাতে সে পাশের বাসার বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে ছিল বলে তিনি জানতেন। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে সিদ্ধার্থ বাড়িতে ফেরে।’


সিদ্ধার্থের বাবা কানু দাস বলেন, ‘মুগ্ধই এক নম্বর নেশাখোর! ওই আমার ছেলেটাকে সব সময় ডেকে ডেকে খাওয়াত। তারা দুজনে খুন করছে, নাকি আরও কেউ ছিল ওরাই বলতে পারবে। আমি এইটুকুই বলব, আমার যা সত্য জানা আছে, আমি বলে দিছি। প্রশাসন ওকে গুলি করি মারুক। খারাপকে রাখার দরকার নেই। কিন্তু তারা কি দুইজনে চারজনকে খুন করতে পারে? আপনারাই বলুন। ওকে তো পুলিশ নিয়ে গেছে, এখন আমরা আতঙ্কে।’


তবে সীমান্তের বাবা সুবাস দাসের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ছেলে সীমান্ত বাড়িতে ফেরে। রাত ১২টার দিকে সিদ্ধার্থ তাঁদের বাড়িতে এলেও কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে যায়। সীমান্ত সেদিন রাতে বাড়িতেই ছিল, কিন্তু সিদ্ধার্থ তার সঙ্গে ছিল না।’


পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাওয়ার আগে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সীমান্তের বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেলায় তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।


রংপুরে ১০ দিনের মধ্যে ৬ খুন, বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্করংপুরে ১০ দিনের মধ্যে ৬ খুন, বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক

মুগ্ধর বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা সেনা রানীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ বাড়িতে ছিলেন না। শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠে তিনি ছেলের ঘরে তালা দেখতে পান। পরে তালা খুলে দেখেন, মুগ্ধ ঘরে নেই। সকাল ১১টার দিকে মুগ্ধ বাড়িতে ফিরে আসে।

সেনা রানী বলেন, ‘সকালে উঠে দেখি ঘরে তালা। তালা খুলে দেখি মুগ্ধ নেই। পরে ১১টার দিকে বাসায় আসে। হাত-মুখ ধুয়ে নেয়। আমি বাজারে যেতে বললে সে বলে, আজ যাবে না।’

রংপুরে ৪ খুন: স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, কারাগারে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থরংপুরে ৪ খুন: স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, কারাগারে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে। সে দোষী হলে তাকে শাস্তি দিক। কিন্তু এর সাথে কারা জড়িত তাদের বের করা হোক। আমরা ভয়ে আছি। দেখা গেল রাস্তায় বের হইছি, বলল এই যে খুনির মা, ধরো! বের হইলে ভয় লাগে, বাসায়ও ভয় লাগে।’

স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় মাদকের বিস্তার বেড়ে গেছে। উঠতি বয়সের ছেলেরা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সহজে পাওয়ায় নেশা পড়ছে। মাদক কারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া দুইজন মিলে চারজন মানুষকে কীভাবে হত্যা করে। এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না তা দ্রুত বের করতে হবে।

এ ঘটনায় গতকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়েছে। হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও প্রকৃত অপরাধী শাস্তির আওতায় আনার দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।

রংপুরে ৪ খুন: ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা, গ্রেপ্তার ২ তরুণ—জানাল পুলিশরংপুরে ৪ খুন: ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা, গ্রেপ্তার ২ তরুণ—জানাল পুলিশ

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন পরিবারের অভিভাবক। স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম ও মেয়ে আগামীকে নিয়ে তাঁর সংসার। শনিবার গভীর রাতে মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে তাঁদের চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্বজনেরা জানান, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা শনিবার বাড়িতে গিয়ে চারজনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ চারটি মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে শেষকৃত্য হয়।

রংপুরে ৪ খুন: বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন ছিল বাড়ি, চাঁদাবাজি-ডাকাতির সন্দেহ, আটক ২রংপুরে ৪ খুন: বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন ছিল বাড়ি, চাঁদাবাজি-ডাকাতির সন্দেহ, আটক ২

এ ঘটনায় শনিবার রাতেই প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস (২৩) ও মুগ্ধ দাসকে (১৯) আটক করে পুলিশ। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর চিফ মেট্রোপলিটন আদালত-২–এ তাঁদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। এরপর কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি বলেন, ‘আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তাঁরা হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।’

এর আগে রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মাদ আবদুল মাবুদ বলেন, ছাদে ইয়াবা সেবনের বিষয়টি গণপতি চক্রবর্তী দেখে ফেলেছিলেন। পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।

রংপুরে সাবেক শিক্ষকসহ এক পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধাররংপুরে সাবেক শিক্ষকসহ এক পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার

পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘গণপতি চক্রবর্তী স্যার ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধ বা শত্রুতা ছিল না। হত্যার পর আসামিরা ওই বাসায় অবস্থান করেন, গোসল করেন এবং খেজুর ও শসা খান।’

এ ঘটনায় গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা অনলাইন