তালাক, স্মার্টফোন ও নিয়ন্ত্রণ: যেভাবে আফগানিস্তান শাসন করছে তালেবান
আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে অধিকাংশ কর্মক্ষেত্র থেকে নারীদের বাদ দেওয়া, তাদের মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা এবং একা ভ্রমণ কিংবা বিনোদন কেন্দ্রে যাওয়ার ওপর নানা কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার।
তালেবানের ক্ষমতা দখলের অর্ধদশক ছোঁয়ার এই মুহূর্তে তাদের প্রভাবশালী নেতা, সাবেক আত্মঘাতী হামলা পরিকল্পনাকারী কিংবা আত্মগোপনে বহুবছর কাটানো লোকজনের-(যারা এখন প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সেনা)- সঙ্গে দুই বছর ধরে কথা বলে দেশটির বর্তমান শাসনব্যবস্থা,বিধিনিষেধ ও জনজীবনের চিত্র তুলে ধরেছে বিবিসি।
গভর্নরের দপ্তরে তরুণীর তালাকের লড়াই
উত্তর আফগানিস্তানের জাউজান প্রদেশের শেবারঘান শহরে তৎকালীন গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদির কার্যালয়ে বোরকা ও রোদচশমায় নিজেকে সম্পূর্ণ ঢেকে হাজির হন ১৮ বছর বয়সী তরুণী তুবা (ছদ্মনাম)।
যে দেশে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষাই নিষিদ্ধ, সেখানে সেই তরুণী অত্যন্ত শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে স্বামীর মাসের পর মাস ধরে চালানো নির্যাতন ও মারধরের বর্ণনা দিয়ে সরাসরি তালাকের দাবি জানান।
একসঙ্গে থাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তুবা গভর্নরকে স্পষ্ট বলেন, “একসঙ্গে থাকার মতো সামান্যতম সুযোগ থাকলেও আমি এখানে আসতাম না। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।”
গভর্নর সারহাদি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বলেন, “তালাকের পর তোমাকে কে বিয়ে করবে? তোমার মান-সম্মান নষ্ট হবে।”
জবাবে তরুণী সরাসরি বলেন, “জনাব গভর্নর, আমার মান-সম্মান তো আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে।” পরে উপস্থিত বয়োবৃদ্ধ, রক্ষী ও কর্মকর্তাদের সামনে গভর্নর হেসে মন্তব্য করেন, নারীরা “বুদ্ধিহীন” এবং তাদের “মস্তিষ্কের ঘাটতি রয়েছে”।
শরিয়া আইন অনুযায়ী, কোনও স্ত্রী যদি তার স্বামীর কাছে তালাক চান, তবে বিয়ের সময় স্বামী তাকে যে অর্থ বা মোহরানা দিয়েছিলেন, তার কিছু অংশ বা সম্পূর্ণটাই স্ত্রীকে ফেরত দিতে হতে পারে।
বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ মিলে সাধারণত একটি আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে একমত হয়। কিন্তু ওই তরুণীর স্বামী বিয়ের দেনমোহরের চার গুণ অর্থ ফেরত দাবি করে, যা দিতে তরুণীর পরিবার অস্বীকৃতি জানায়।
গভর্নর তখন তরুণীকে আলাদা কক্ষে রাখার ব্যবস্থা করতে বলেন এবং মারধর করলে স্বামীকেই জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে এই মধ্যস্থতায় সন্তুষ্ট না হয়ে তরুণীর পরিবার আদালতেই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যদিও তালেবান বিচারব্যবস্থায় স্বামীর সম্মতি ছাড়া নারীর পক্ষে তালাক পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস ও স্মার্টফোনে নিষেধাজ্ঞা
গভর্নর আবদুল্লাহ সারহাদি ১৯৯০-এর দশকে তালেবানের প্রথম দফার শাসনামলে সামরিক কমান্ডার ছিলেন। ২০০১ সালে মার্কিন কোয়ালিশন বাহিনীর কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। গুয়ানতানামো বে-তেও কয়েক বছর বন্দী ছিলেন তিনি। পরে ছাড়া পান।
তালিবান যখন পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা ফিরে পায়, তখন তিনি গভর্নর হন প্রথমে বামিয়ান প্রদেশে। বর্তমানে সারহাদি উত্তরাঞ্চলীয় কুনদুজ প্রদেশের একটি সামরিক বাহিনীর উপ-কমান্ডার পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০০-এর দশকে বামিয়ানের দেড় হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক বুদ্ধ মূর্তি বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সারহাদি অনুশোচনাহীন কণ্ঠে বলেন, “আমি নিজ হাতে ওগুলো ধ্বংস করেছি। আমরা মূর্তি বিক্রি না করে তা ভেঙে ফেলি। ওটা আল্লাহর নির্দেশ ছিল।”
কথা বলার সময় নিজের একটি পুরনো বোতামের ফোন দেখিয়ে সারহাদি জানান, সম্প্রতি তালেবান কর্মকর্তাদের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় দাপ্তরিক কাজে তথ্য আদান-প্রদান ও গতি ধীর হয়ে পড়েছে।
তবে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি সতর্কতার সঙ্গে বলেন, “এ নিয়ে আর কিছু বললে আমারই সমস্যা হয়ে যাবে।”
ক্ষমতাসীন প্রশাসনে সাবেক আত্মঘাতী হামলা পরিকল্পনাকারী
রাজধানী কাবুলে বিবিসি-র সঙ্গে কথা বলেন আরেক তালেবান কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বদর। আগে তিনি রাজধানী কাবুলে তালেবানের আত্মঘাতী হামলা পরিচালনা করতেন এবং শহরের অলিগলি তার নখদর্পণে ছিল বলে জানান।
অতীতের একজন আত্মঘাতী হামলা পরিচালনাকারী হয়েও তিনি স্থান পেয়েছেন ক্ষমতাসীন প্রশাসনে।
আত্মঘাতী হামলায় সাধারণ মানুষ হতাহতের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তালেবান কেবল মার্কিন গাড়িবহরকে হামলার নিশানা করত। আর সাধারণ মানুষদেরকে বিদেশি সেনাদের ঘাঁটি থেকে দূরে সরে থাকতে বলা হত।
তবে, বিশেষ করে সাধারণ জনসমাগম এলাকাগুলোতে আত্মঘাতী হামলা হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বদর এর উত্তর এড়িয়ে যান।
বর্তমানে চিকিৎসার জন্য সরকারি দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছেন বদর। তবে এর আগে তিনি আফগানিস্তানের কারাগার উপ-প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এবং ঠিক সেই কারাগারই পরিচালনা করেছেন যেখানে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তাকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বন্দি রাখা হয়েছিল।
বদর বিবিসি সাংবাদিকদের একটি আদিবাসী সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। সেখানে একটি দাতব্য ফাউন্ডেশনের প্রধান সুলতান মোহাম্মদ তালাঈ তাকে একটি পদক দিয়ে সম্মানিত করার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এক অপ্রত্যাশিত মোড় নেয়।
তালাঈ বলেন, “জনাব বদর আফগানিস্তানের গর্ব এবং একজন মহান যোদ্ধা, তবে আমার একটি অভিযোগও আছে।”
“যদি স্কুল এবং শিক্ষা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হত, তবে তা আফগানিস্তানের জন্য একটি দারুণ কাজ হত। আশা করি এই কথাটি আপনাকে অসন্তুষ্ট করেনি।”
একথার পর এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে। শ্রোতারা বুঝতে পারছিলেন না কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। দ্রুত তালাঈর মাইক্রোফোনটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরে বদর বিবিসি-কে বলেন, “আমি বালিকা বিদ্যালয়গুলো পুনরায় খোলার অনুরোধ করেছিলাম। জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।”
তিনি আরও বলেন, “আরও কিছু বিষয় ছিল যা আমি বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে আর বেশি কথা বলতে দেয়নি। প্রায়ই যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন তাদেরকে অনেক বেশি মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।”
নারীশিক্ষা নিয়ে এখনও ‘শরিয়াভিত্তিক সমাধান’ খুঁজছে সরকার
জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ ২০২১ সাল থেকে তালেবান সরকারের একজন পরিচিত মুখ বা মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। এবারই প্রথম তিনি নিজের দীর্ঘদিনের ছদ্মনামের আড়াল ছেড়ে আসল নাম ‘তাহের শাহ সিদ্দিকী’ প্রকাশ করেন।
তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের দুইদিন পরই জাবিহুল্লাহ মুজাহিদের প্রথম সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে আমেরিকানদের বিপুল অর্থায়নে তৈরি এক বিলাসবহুল সংবাদ সম্মেলন কেন্দ্রে।
সে সময়ে বিশ্ববাসীর কাছে আফগান নারীদের শিক্ষা ও কাজের অধিকার দেওয়ার যে আশ্বাস জাবিহুল্লাহ এই কক্ষ থেকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা রাখতে ব্যর্থ হলেন কেন তিনি?
এমন প্রশ্নে তার জবাব, আমরা শরিয়া আইনের আওতায় থেকে নারী অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের উচিত শরীয়ার দৃষ্টিতে সবকিছু দেখা।”
তবে সরকারি কার্যালয়ে নারীদের কাজ করার অনুমতি দিলে ‘অনৈতিকতা’ সৃষ্টি হতে পারে এবং নারীদের মর্যাদাও ক্ষুন্ন হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আর নারীদের শিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে এখনও ‘শরিয়াভিত্তিক সমাধান’ খোঁজা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর তালেবান সরকারের দমনপীড়নের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জাবিহুল্লাহ বলেন, “আফগানিস্তানের মতো সমাজে আমাদের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা বা কড়াকড়ি রয়েছে।”
“আমরা সংবাদমাধ্যমকে যা খুশি তা-ই অপপ্রচার করতে দিতে পারি না। তারা ইসলামিক আইন এবং ধর্মীয় রীতিনীতির বিরুদ্ধে কোনও কিছু প্রচার করতে পারে না।”
কন্দাহারে কড়াকড়ি ও চরম দারিদ্র্য
তালেবান সরকার মূলত রাজধানী কাবুলে হলেও, মুজাহিদরা দক্ষিণের শহর কান্দাহারে অনেক বেশি সময় কাটান, যা তালেবানের মূল প্রাণকেন্দ্র এবং কেউ কেউ একে এখন কার্যত রাজধানীও মনে করেন।”
সেই কন্দাহারে এখন কড়াকড়ি চরম পর্যায়ে রয়েছে। পুরুষদের দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, রেডিওতে গান ও নারীর কণ্ঠ সম্প্রচার নিষিদ্ধ এবং শহরের ভিডিও ধারণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কন্দাহারে অবস্থান করলেও তিনি কখনও গণমাধ্যমের সামনে আসেন না।
কন্দাহার থেকে দূরে ধূলিমলিন পাহাড়ি অঞ্চলে সাবেক তালেবান যোদ্ধারা বিবিসি সাংবাদিকদেরকে তাদের পুরনো গোপন গুহা নেটওয়ার্ক ঘুরে দেখান।
আবিদ লালাই নামে এক সাবেক যোদ্ধা (যিনি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন নিরাপত্তা চৌকিতে কর্মরত) গুহার সেই ছিদ্রগুলো দেখান, যেখান থেকে তারা মার্কিন বাহিনীর দিকে গুলি ছুড়তেন।
আরেক সাবেক যোদ্ধা আবদুল সামাদ এক চিহ্নহীন কবর দেখিয়ে জানান, তালেবানের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে তার বাবা সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, আফগানিস্তানের চারজনের মধ্যে তিনজন মানুষ বর্তমানে মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
পাহাড়ি এলাকার মানুষ আজও পানি, সড়ক ও চিকিৎসাসেবার অভাবে হাহাকার করছেন। তবুও সামাদ বিশ্বাস করেন, “সরকার আমাদের ভুলে যায়নি, তারা হয়ত অন্য কাজে ব্যস্ত। একদিন তারা ঠিকই আমাদের দিকে নজর দেবে।”
তালেবানের এই শাসনব্যবস্থা ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক নারী আন্দোলনকারী হুদা (ছদ্মনাম) বলেন, “জীবন সম্পর্কে যাদের কোনও ধারণাই নেই, তারা কীভাবে ক্ষমতায় বসে আছে তা ভাবলে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।
“তালেবান মূলত শিক্ষিত নারীদের ভয় পায়। তারা চায় নারীরা অশিক্ষিত থাকুক, যাতে কোনও জ্ঞানী পুরুষ তৈরি না হয়। কারণ, শিক্ষিত পুরুষ মানেই তালেবান শাসনের সমাপ্তি।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ