শনিবার, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০২৬

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি

ফাইল ছবি ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৪ অপরাহ্ন অর্থনীতি
ফাইল ছবি ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৪ অপরাহ্ন
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি

দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়াতে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ঋণচুক্তি সই হয়েছে।


প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের সরাসরি উপস্থিতিতে এই দ্বিপক্ষীয় ঋণ চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মোস্তফা জুলফিকার হাসান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


চট্টগ্রামে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য এ ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এর নির্বাহী পরিচালনা পর্ষদ গত জুনে প্রকল্পটির জন্য ১ হাজার ৪ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করে।


প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানের প্রায় তিন গুণ হবে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন।


দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে আরও ৩০ লাখ টন পরিশোধনের সক্ষমতা যুক্ত হবে। ফলে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে।

ইকোনমিক রিলেশনস ডিভিশনের (ইআরডি) কার্যপত্র অনুযায়ী, এর অর্থায়ন দুটি প্যাকেজে দেওয়া হবে। এর মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’-এর আওতায় ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’-এর আওতায় ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম প্যাকেজের আওতায় আরও ৬ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদান রয়েছে।


ঋণের মেয়াদ ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং পরবর্তী ১৫ বছরে ছয় মাস অন্তর কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণের অর্থায়ন ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রচলিত হারের তুলনায় তুলনামূলক বেশি বলে ইআরডির নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


২০২৬ সালের ৫ জুলাইয়ের ছয় মাস মেয়াদি জামানতযুক্ত রাতারাতি অর্থায়নের সুদের হার হার ৩ দশমিক ৮৪৬২৭ শতাংশ ধরে ঋণের মোট মার্কআপ হার ৫ দশমিক ৪৪৬২৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।


এর আগে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি প্রায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল। পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকায় আনা হয়।


দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের পেট্রোলিয়াম চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ পূরণ করে। নতুন ইউনিট চালু হলে পরিশোধন সক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় দেশে উৎপাদিত জ্বালানির সরবরাহও বাড়বে।


প্রকল্পের আওতায় ইউরো-৫ মানের পেট্রল ও ডিজেল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, ৬০ হাজার টন এলপিজি, ৬ লাখ টন ইউরো-৫ মানের পেট্রল, ১১ লাখ টন ইউরো-৫ ডিজেল, ২ লাখ টন লুব বেস অয়েল এবং ৫ লাখ টন জেট ফুয়েল উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।


ফলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বাড়বে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে সংকট তৈরি হলে দেশের নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।


ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। ২০১০ সালে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৩ সালে সরকার প্রকল্পটির জন্য প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন করলেও কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় একাধিক পরিবর্তন আসে।


২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। পরে বিদেশি অর্থায়নের চেষ্টা করা হয়। শেষ পর্যন্ত সরকারি অর্থায়ন ও বিপিসির নিজস্ব অর্থের পাশাপাশি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঋণ যুক্ত হচ্ছে।


দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে এর বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন।


চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অপরিশোধিত তেলের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন ২৬ দিন বন্ধ ছিল। পরে নতুন করে অপরিশোধিত তেল আসার পর ৮ মে উৎপাদন শুরু হয়। এ ঘটনা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিও সামনে নিয়ে আসে।


সংশ্লিষ্টদের মতে, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়ন হলে দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।


তথ্যসূত্র:  বাংলানিউজ