সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২৬

মোহনপুরে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও ওসি একই মঞ্চে!

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৯ অপরাহ্ন
মোহনপুরে সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও ওসি একই মঞ্চে!

আদালতে দণ্ডিত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত একাধিক মামলার আসামি প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অংশ নিচ্ছেন রাজনৈতিক দলের অনুষ্ঠানে। এমনকি পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতেও নির্বিঘ্নে অবস্থান করছেন তিনি। শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে ওই আসামির পাশে দেখা গেছে থানার অফিসার ইনচার্জকেও। অথচ থানায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার তথ্য রয়েছে প্রায় এক বছর ধরে।


এমন ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজশাহীর মোহনপুরে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও তাকে গ্রেফতারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না থানা পুলিশ।


গত ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌর বিএনপির উদ্যোগে দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি শাহীন আলমকে দেখা যায়। অনুষ্ঠানে মোহনপুর থানার একাধিক পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাদের সামনেই শাহীন আলম প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানে অংশ নেন।


অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মিজানুর রহমান উপস্থিত হলে শাহীন আলমকে তার কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা যায়।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাহীন আলম (৪৫) মোহনপুর উপজেলার হরিদাগাছি গ্রামের ইসমাইল স্বর্ণকারের ছেলে।


আদালত ও ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, শাহীন আলমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর সিআর মামলা নম্বর ২৩৭/১৯-এ দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় তাকে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ২১ লাখ ৮৬ হাজার ২৪১ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


এ ছাড়া যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ-২ আদালতের সিআর মামলা নম্বর ২৯৮/১৮-এ একই আইনের ১৩৮ ধারায় তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।


জেলা যুগ্ম জজ-১ আদালতের দায়রা মামলা নম্বর ৮১৮/২০-এ তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ ৮০ হাজার ৩৪১ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত-৪-এর দায়রা মামলা নম্বর ৮০৫/২০-এ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ২ লাখ ৩১ হাজার ৩৮৬ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। ওই দুটি মামলার মধ্যে একটির আপিল আদালত খারিজ করে দিয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।


এ ছাড়া মোহনপুর থানার এফআইআর নম্বর ৩/১৭৮, তারিখ ২ অক্টোবর ২০১৭, জিআর মামলা নম্বর ১৭৮-এ দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। ওই মামলায়ও আদালত তাকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, শাহীন আলমের বিরুদ্ধে প্রায় ২৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৯০ টাকার অর্থঋণ আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে।


স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মামলায় সাজা হওয়ার পরও শাহীন আলম প্রকাশ্যেই এলাকায় চলাফেরা করছেন। তাকে থানা গেট, উপজেলা চত্বর, রাজনৈতিক সভা সমাবেশ এমনকি তার ব্যক্তিগত চেম্বারেও দেখা যায় বলে দাবি তাদের।


স্থানীয়দের প্রশ্ন, আদালতে সাজাপ্রাপ্ত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত একজন আসামি যদি প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করেন, তাহলে তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন? পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সামনে তিনি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগই বা পাচ্ছেন কীভাবে?


তবে স্থানীয়দের কেউ কেউ পুলিশের সঙ্গে আসামির যোগসাজশের অভিযোগ তুললেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ তারা উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।


মামলার বাদীপক্ষ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের কেশরহাট এসএমই শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু বাকার বলেন, আসামিকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছে।


তিনি বলেন, পুলিশ তাকে জানিয়েছে—‘আমরা আসামিকে খুঁজে পাচ্ছি না, আপনারা দেখিয়ে দেন।’ এরপরও ‘আজ ধরব, কাল ধরব’ বলে সময় পার করা হচ্ছে।


অভিযোগের বিষয়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আসামিকে আমার চেনা নেই। তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে কি না, তাও জানি না। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’


ওসির এমন বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মো. মামুন অর রশীদের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা তারও জানা নেই। প্রতিবেদককে তিনি কার্যালয়ে গিয়ে ওয়ারেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ দেখাতে বলেন। প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।


আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের প্রশ্ন, আদালতে দণ্ডিত ও গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত কোনো ব্যক্তি যদি পুলিশের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেন, অথচ তাকে গ্রেফতার করা না হয়, তাহলে পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।


তাদের মতে, আদালতের পরোয়ানা বাস্তবায়ন পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। কোনো আসামি প্রকাশ্যে চলাফেরা করলে তাকে ‘খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’—এমন দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।