হরিপুরে ব্লক সরে পদ্মায় ভাঙনের শঙ্কা, ডুবেছে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’,
কয়েক দিন আগেও জায়গাটি ছিল মানুষের আনাগোনায় মুখর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কেউ কেউ জায়গাটিকে বলছিলেন রাজশাহীর ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’। সেই চরের বড় অংশ এখন থইথই পানিতে। ঘরবাড়ি ছেড়ে শহরের দিকে চলে গেছেন অধিকাংশ বাসিন্দা। গবাদিপশু, ধান, জ্বালানি ও সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন তাঁরা। এর মধ্যেই পদ্মার পানি বাড়তে থাকায় পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকায় নদীতীর ভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদীতীর রক্ষায় বসানো ব্লকের কিছু অংশ সরে গেছে। কোথাও কোথাও ব্লকের নিচের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। নদীর স্রোত আরও বাড়লে ভাঙন তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে বেড়পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে গেছে। কোথাও ব্লকের নিচ থেকে মাটি ধসে পড়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীতীরে চাপও বাড়ছে। এ অবস্থায় তীরের কাছাকাছি থাকা বসতবাড়ি নিয়ে আতঙ্কে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর। তিনি বলেন, রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়ছে। আগামী এক থেকে দুই দিন পানি আরও কিছুটা বাড়তে পারে। তবে আপাতত বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা নেই।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর আরও বলেন, আজকে বেলা ১২টায় পদ্মার বোয়ালিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২২ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার ৮৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা ও স্রোত বাড়ায় নদীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারি করা হচ্ছে। হরিপুর এলাকার নদী পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোথাও ভাঙন বা অন্য কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে।
পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া এলাকার নদীতীরে বাড়ি বেগম জাহানের। আতঙ্কিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘পদ্মার পানি আর এক ধাপ বাড়লেই আমার বাড়ি পানির নিচে চলে যাবে। চোখের সামনে নদীর ব্লক সরে যেতে দেখে প্রতিদিনই ভয় বাড়ছে। আমার বাড়িটি এখন চরম ঝুঁকিতে, কখন কী হয় সেই আতঙ্কে আছি। দ্রুত নদীতীর রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’ একই এলাকার বাসিন্দা আবেদ আলী বলেন, ‘পদ্মার পানি বেড়ে তীরে চাপ পড়েছে, শুরু হয়েছে ভাঙন। নদী রক্ষার জন্য বসানো ব্লকও সরে যাচ্ছে, তাই আমাদের ভয় আরও বেড়ে গেছে।
কখন যে ভাঙন বাড়তে বাড়তে বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়, সেই চিন্তায় আমরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছি। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের বাড়িঘর ও জীবন-জীবিকা রক্ষার দাবি জানাচ্ছি।’ হরিপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য ফরিদুল ইসলাম সাহেব জাদা বেড়পাড়া এলাকায় নদী রক্ষা ব্লক সরে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পদ্মার তীর রক্ষায় বসানো ব্লকগুলো ক্রমেই সরে যাচ্ছে। কীভাবে কাজটি করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার কে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কেন ব্লক সরে গেল, সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের তদন্ত করা উচিত।
পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের বেড়পাড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চর খিদিরপুরের ‘মিডিল চরে’ এখন অন্য রকম দুর্ভোগ। কিছুদিন আগেও যে চর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল, পানি বাড়ায় সেই চরের বড়ো অংশ এখন ডুবে গেছে। অনেক বাড়ির উঠান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোনো কোনো বাড়ির চারপাশে পানি। কোথাও আবার পানির মধ্যেই গরু-ছাগল বেঁধে রাখা হয়েছে। রান্নার সুযোগ নেই অনেক পরিবারের। এর সঙ্গে রয়েছে সাপের আতঙ্ক। এই চরের বাসিন্দাদের বড় একটি অংশের জীবিকার প্রধান অবলম্বন গবাদিপশু। কারও ৫০টি, কারও ৬০টি, আবার কারও রয়েছে শতাধিক গরু। তাই ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হলেও গবাদিপশু ফেলে যাওয়ার সুযোগ নেই। নৌকায় গাদাগাদি করে গরু নিয়ে শহরের দিকে আসছেন তাঁরা। কোনো নৌকায় কয়েকটি গরু, আবার কোনো নৌকায় ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত গরু তোলা হচ্ছে। সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে ধান, জ্বালানি, মাছ ধরার জালসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
হরিয়ান ইউনিয়নের ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, চরে এখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আছেন। অধিকাংশ পরিবার গরু-ছাগল নিয়ে শহরে চলে গেছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ ভাড়া বাড়িতে উঠেছেন। তাঁর হিসাবে, চরটিতে প্রায় ১০ হাজার গবাদিপশু রয়েছে। এসব পশুর জন্য পবার খড়খড়ি এলাকায় বিসিক শিল্পনগর-২ এবং নগরের বিনোদপুর এলাকার বেতার মাঠে জায়গা করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে এত বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করাই এখন বড় সমস্যা।
ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, মানুষের খাবার কোনোভাবে জোগাড় করা গেলেও গবাদিপশুর খাবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন মালিকেরা। চরে কাঁচা ঘাস পাওয়া যাচ্ছে না। শহরে খাবারের দামও বেশি। একই সঙ্গে মানুষেরও কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে।
এই চরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, শহরে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন। তার ওপর গরু-ছাগল রাখারও জায়গা নেই। নিজেরাই যখন খাবারের সংকটে, তখন গবাদিপশুর খাবার জোগাড় করা বড় চিন্তার বিষয়। চর খিদিরপুরে প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি রয়েছে। পানি বাড়ায় এসব পরিবারের অনেকেই শহরের দিকে চলে গেছেন। একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চর খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহের বিভিন্ন এলাকায়। রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, চর খিদিরপুরে পানি ওঠায় প্রায় ২০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।
ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে প্রায় ২৫ ধরনের পণ্য রয়েছে।বন্যাকবলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চর ও মাঝারচরসহ তিনটি স্থানে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাঁদের গবাদিপশুর জন্য আপাতত ভ্রাম্যমাণভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। চর খিদিরপুরে প্রায় ১০ ফুট উঁচু দুটি বড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখানে মানুষের পাশাপাশি কয়েক হাজার গবাদিপশু রাখার সুযোগ থাকবে। পদ্মার পানি আপাতত বিপৎসীমার নিচে থাকলেও চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। একদিকে পানিতে ডুবে যাচ্ছে বসতভিটা ও চলাচলের পথ, অন্যদিকে হরিপুরের বেড়পাড়ায় নদীতীরের ব্লক সরে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। স্থানীয় বাসিন্দাদের এখন একটাই দাবি—পানি আরও বাড়ার আগেই নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।