চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার পানি কমলেও দুর্ভোগে নিম্নাঞ্চলের মানুষের জীবন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে টানা ১০দিন পানি বাড়ার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা, মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি কমতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে নিম্ন অঞ্চলের বানবাসি দুর্ভোগ কাটেনি। গত দুই দিনে পদ্মার পানি কমেছে ১১ সেন্টিমিটার। তবে মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেড়েছে এবং ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে সামান্য কমেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ স্টেশনগুলোর ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের সকাল ৯টার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০ সেপ্টেম্বর পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ২১ দশমিক ৬৯ মিটার। পরদিন তা বেড়ে ২১ দশমিক ৭৬ মিটারে দাঁড়ায়। ১২ সেপ্টেম্বর আরও বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৭৯ মিটার। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর পানি কমে ২১ দশমিক ৭৩ মিটার এবং ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে আরও কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৬৮ মিটারে।
পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পদ্মার বিপৎসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার। সে হিসাবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় পদ্মার পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বরের সর্বোচ্চ ২১ দশমিক ৭৯ মিটার থেকে দুই দিনে পানি কমেছে ১১ সেন্টিমিটার।
অন্যদিকে মহানন্দা নদীর পানির চিত্র কিছুটা ভিন্ন। খালঘাট গেজ স্টেশনে ১০ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা ছিল ১৯ দশমিক ৩৩ মিটার। ১১ সেপ্টেম্বর বেড়ে হয় ১৯ দশমিক ৪৩ মিটার, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯ দশমিক ৫০ মিটার এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯ দশমিক ৫৩ মিটার। তবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে তা কমে ১৯ দশমিক ৪৭ মিটারে নেমেছে। অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বরের তুলনায় এক দিনে মহানন্দার পানি কমেছে ৬ সেন্টিমিটার।
খালঘাট গেজ স্টেশনে মহানন্দা নদীর বিপৎসীমা ২০ দশমিক ৫৫ মিটার। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ০৮ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পুনর্ভবা নদীর পানিও গত কয়েক দিনে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। রহনপুর গেজ স্টেশনে ১০ সেপ্টেম্বর পানির উচ্চতা ছিল ১৯ দশমিক ৩৩ মিটার। ১১ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৬ মিটার, ১২ সেপ্টেম্বর ১৯ দশমিক ৫৩ মিটার এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯ দশমিক ৫৭ মিটারে পৌঁছায়। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে সামান্য কমে পানির উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৫৬ মিটারে।
রহনপুর গেজ স্টেশনে পুনর্ভবা নদীর বিপৎসীমা ২১ দশমিক ৫৫ মিটার। সে হিসাবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৯৯ মিটার নিচে রয়েছে।
তিন নদীর পাঁচ দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন নদীতেই পানি বাড়ার প্রবণতা ছিল। ১৩ সেপ্টেম্বর পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করে। একই দিন মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানি সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছায়। এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে তিন নদীর পানিই আগের দিনের তুলনায় কমেছে। এর মধ্যে পদ্মার পানি কমেছে ৫ সেন্টিমিটার, মহানন্দার ৬ সেন্টিমিটার এবং পুনর্ভবার ১ সেন্টিমিটার।
তবে নদীর পানি কমার এই প্রবণতা এখনো নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার মতো অবস্থায় পৌঁছেনি। নদীর পানি বাড়ার সময় জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বসতবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কোথাও কোথাও এখনো পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে তুলনামূলক উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় রান্না, খাবার, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ ও দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
পানি দীর্ঘ সময় স্থির থাকায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ ও দিনমজুররা। পানিবন্দি হয়ে অনেকের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে একদিকে ঘরে পানি, অন্যদিকে আয়-রোজগার বন্ধ থাকায় পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
বন্যার পানিতে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোপা আমনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের জমিতে পানি ঢুকে পড়েছে। নদীর পানি কমতে শুরু করলেও মাঠের পানি দ্রুত না নামলে ফসলের ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। কৃষকেরা এখন নদীর পানি দ্রুত কমে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
পানির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় নিয়মিত পাঠদান বন্ধ রয়েছে। ফলে এসব এলাকার শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হলে শিক্ষা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন ও শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম জানান, চলতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০, ১৫ ও ২০ কেজি করে চাল বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি দুই উপজেলায় মেডিকেল টিম কাজ করছে।
নদীর পানি কমতে শুরু করায় নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে বাড়িঘর ও ফসলের মাঠ থেকে পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, পদ্মা নদীর পানি কমার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা নেই। তবে নদীগুলোর পানি ও নিম্নাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ স্টেশনের তথ্য বলছে, ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে জেলার তিন প্রধান নদীর পানিই বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। পদ্মার পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার, মহানন্দার ১ দশমিক ০৮ মিটার এবং পুনর্ভবার ১ দশমিক ৯৯ মিটার নিচে রয়েছে। তবে নদীর পানি কমলেও ইতোমধ্যে প্লাবিত নিম্নাঞ্চলের পানি সরে যেতে সময় লাগবে।
ফলে নদীর পানির বর্তমান প্রবণতা কিছুটা স্বস্তির হলেও পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ এখনই শেষ হচ্ছে না। নদীর পানি আরও কমে বসতবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি থেকে পানি নেমে গেলেই কেবল জেলার বন্যা পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নতি হয়েছে বলা যাবে।#