চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্কুল ফিডিঙের খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন জরিমানা-মামলাতেও বন্ধ হচ্ছে না ঘটনার পুনরাবৃত্তি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু করা স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার খেয়ে বারবার অসুস্থ হচ্ছে শিশুরা। এ সময় অসুস্থ শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। গত ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে একাধিক ঘটনা ঘটেছে। নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগে জরিমানা, মামলা ও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ঘটনার পুনরাবৃত্তি থামছে না।
গত ১ অক্টোবর শিবগঞ্জ উপজেলার লহলামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিঙের খাবার খেয়ে ১২ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার নয়াগোলা পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের ঘটনায় ১১ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে সদর উপজেলার শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয় ২০ শিক্ষার্থী। পরে ১৭ জুন মহারাজপুর ইউনিয়নের সালিম ডোলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের ঘটনায় ১৫ শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়। শিবগঞ্জ উপজেলার চাতরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও স্কুল ফিডিঙের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা ডিম ও নিম্নমানের পাউরুটি খাওয়ার পরই শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া কর্মসূচিতে খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে কল্যাণমূলক এই উদ্যোগই শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জমির মো. হাসিবুস সাত্তার জানান, অসুস্থ কয়েকজন শিশুর মধ্যে বমি, পেটব্যথা ও খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা গেছে। খাবার গ্রহণের পর একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় খাদ্যে ভেজালের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে অসুস্থতার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষায় বিষক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে পাওয়া তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। খাবারের মান যাচাই ও তদারকির জন্য প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে অভিভাবকদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের এপ্রিলে শংকরবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঘটনায় গ্রাম উন্নয়ন কর্মকে (গাক) ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে সদর উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি ঘটনায় ১৫ দিনের জন্য পাউরুটি সরবরাহ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, স্কুল ফিডিঙের খাবার খেয়ে প্রায়ই শিশুরা অসুস্থ হচ্ছে এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এতে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা উচিত।
সুত্র জানায়, জেলার চারটি উপজেলার ৬১৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন স্কুল ফিডিঙের খাবার সরবরাহ করে বেসরকারি সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক)। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য পরিচালিত এ কর্মসূচিতে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গি বলেন, তদন্তে নিম্নমানের খাবার সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খাবারের মান তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নিম্নমানের পাউরুটি ও ডিম সরবরাহের অভিযোগে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামলা করেছেন। নিম্নমানের পাউরুটি সরবরাহের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই দফায় প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের দল সরেজমিনে তদন্ত করেছে। এ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।