মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬

বাঘায় সেতুর অভাবে দুর্ভোগ, ভাঙনে ঘরহারা শতাধিক পরিবার

আমানুল হক আমান, বাঘা ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আমানুল হক আমান, বাঘা ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ন
বাঘায় সেতুর অভাবে দুর্ভোগ, ভাঙনে ঘরহারা শতাধিক পরিবার

পদ্মা পেরোলেই উপজেলা সদর, কিন্তু সেই নদীই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার তিনটি চরকে। চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়াড়কাদিরপুরের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। উত্তাল নদী পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিদিনই ঝুঁকি নিতে হয় তাঁদের। সেতুর অভাবে যোগাযোগের দুর্ভোগের পাশাপাশি নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে আরও সংকটে পড়েছেন চরবাসী।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি চরের মধ্যে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়াড়কাদিরপুর দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছে। এসব চরের বাসিন্দাদের প্রতিদিন পায়ে হেঁটে চৌমাদিয়া ঘাটে আসতে হয়। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পদ্মা পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় গোকুলপুর ঘাটে। এরপর ভ্যানে করে যেতে হয় উপজেলা সদরে। শুষ্ক মৌসুমে নদী পার হতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগলেও বর্ষায় সময় লাগে এক ঘণ্টার বেশি। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয় তাঁদের।


সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১১টার দিকে পদ্মা পারাপারের সময় চৌমাদিয়া চরের বাসিন্দা সোলেমান হোসেন বলেন, “যাতায়াতের একমাত্র ভরসা নৌকা। উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। বর্ষা-শুষ্ক দুই মৌসুমেই পায়ে হেঁটে ঘাটে আসতে হয়, এরপর নৌকায় নদী পার হতে হয়।” তিনি গোকুলপুর ঘাটে পদ্মা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি জানান।


চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর চৌমাদিয়া ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান জানান, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়াড়কাদিরপুর—এই তিন ওয়ার্ডে প্রায় ৭৫০টি পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৫০ জন। আতারপাড়া ওয়ার্ডে ভোটার ৩৭৩ জন, চৌমাদিয়ায় ৫৫৬ এবং দিয়াড়কাদিরপুরে ৯৮৭ জন। এত মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নেই কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্যও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।


এর মধ্যে নতুন করে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে পদ্মার ভাঙন। অসময়ে নদীভাঙন শুরু হওয়ায় মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে দুই শতাধিক পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। ঘর নির্মাণের সামর্থ্য না থাকায় অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে বলে জানান আবদুর রহমান। নদীভাঙন ও যোগাযোগসংকট মিলিয়ে চরের মানুষের জীবন হয়ে উঠেছে আরও অনিশ্চিত।


প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে গোকুলপুর খেয়াঘাট ইজারা দেওয়া হয়। এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যাত্রী এবং অনেক মোটরসাইকেল পারাপার হয়। রাজশাহী ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যাতায়াতের জন্যও ঘাটটি গুরুত্বপূর্ণ। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, রাজশাহী শহরে চিকিৎসক দেখাতে যাচ্ছেন তিনি। বাসে গেলে দুই-তিন ঘণ্টা বেশি সময় লাগে বলে স্বল্প সময়ে পৌঁছাতে এ খেয়াঘাট ব্যবহার করেন। তবে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পেতেও নানা সমস্যার মুখে পড়েন।


গোকুলপুর খেয়াঘাটের নৌকার মাঝি সাজামাল হোসেন ও নিয়ারুল ইসলাম জানান, প্রতিটি নৌকায় দুজন করে শ্রমিক কাজ করেন। যাত্রীপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় ৭০ টাকা। তাঁদের মতে, নদীর ওপর সেতু নির্মাণ করা হলে যাতায়াত সহজ হবে এবং মানুষের সময় ও খরচ দুটোই কমবে।


অন্যদিকে, চকরাজাপুর, লক্ষ্মীনগর, কালিদাসখালী, পলাশিফতেপুর, হবিরচর, নিচফলাশি ফতেপুর, আমবাগান চর ও দাদপুরসহ আটটি চরেও যোগাযোগের দুর্ভোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হালিম মাস্টারের ঘাটে সেতু নির্মাণের আবেদন জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পদ্মার প্রায় ৫০ মিটার প্রশস্ত একটি ক্যানেল পারাপারেই তাঁদের অতিরিক্ত সময় ও টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।


চরবাসীর দাবি, বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁদের মতে, সেতু হলে শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগই কমবে না, বরং দুর্গম চরগুলোর সঙ্গে উপজেলা সদরের যোগাযোগেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।