রাজশাহীর ইতিহাসে জড়িয়ে আছে ধর্মসভা
রাজশাহীর ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়- রাজশাহী ধর্মসভা। রাজশাহীর ধর্মসভা এই নামটি পদ্মাপড়ের শহরের সংবাদপত্র ও মুদ্রণ শিল্পের শুরুর ইতিহাস। সনাতন ধর্মের দর্শন এবং সংস্কৃতি প্রচারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মসভাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল তৎকালীন রাজশাহীর মুদ্রণ এবং সাময়িক পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাস। সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের স্মৃতিটুকুও মুছে গেছে। তবে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সেই ধর্মসভা পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই ধর্মসভার ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে রাজশাহীর প্রথম সংবাদপত্র ‘হিন্দু রঞ্জিকা’ এবং প্রথম ছাপাখানা হিসেবে পরিচিত ‘তমোঘ্ন যন্ত্রালয়’-এর নাম। রাজশাহীর সংবাদপত্র ও মুদ্রণশিল্পের বিকাশের ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে তাই ফিরে তাকাতে হয় এই প্রতিষ্ঠানটির দিকে। স্থানীয় ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাজশাহীর অতীত ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে ধর্মসভার ইতিহাস সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
রাজশাহীর সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসে রাজশাহী ধর্মসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো ‘হিন্দু রঞ্জিকা’। ১৮৬৫ সালে এই পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাজশাহীতে সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা হয়।
‘হিন্দু রঞ্জিকা’ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন শ্রীনাথ সিংহ রায়। শুরুতে এটি মাসিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও দুই বছর পর ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে এটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ হতে শুরু করে। ‘হিন্দু রঞ্জিকা’র প্রকাশনা তাই কেবল একটি পত্রিকার আত্মপ্রকাশ নয়; এটি ছিল রাজশাহীর জনপরিসরে লিখিত সংবাদ ও মতামত প্রকাশের নতুন দ্বার উন্মোচন।
রাজশাহী ধর্মসভার প্রতিষ্ঠা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের (১৮৬০) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সনাতন ধর্মের দর্শন, আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রচার ছিল এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ধর্মীয় আলোচনা ও চর্চার পাশাপাশি হিন্দু সমাজে শিক্ষার প্রসার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ওই সময় রাজশাহীসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষা, সমাজসংস্কার, ধর্মীয় বিতর্ক ও সংবাদপত্র প্রকাশনাকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। ছাপাখানা ও সাময়িকপত্রের বিস্তার মানুষের চিন্তা, মতপ্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়ে দিচ্ছিল। রাজশাহী ধর্মসভাকে ঘিরেও তেমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠেছিল বলে মনে করেন স্থানীয় ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ছাড়িয়ে ধর্মসভা তৎকালীন সমাজের চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরের পাশাপাশি তৎকালীন প্রগতিশীল সমাজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক ছিল।
১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে দুবলহাটির জমিদার হরনাথ রায়চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি পান। তিনি এই ধর্মসভার জন্য একটি মুদ্রণযন্ত্র কিনে দেন এবং ঘরের ব্যবস্থা করেন। এটিই ছিল রাজশাহীর ইতিহাসের প্রথম মুদ্রণযন্ত্র, যা মূলত ‘হিন্দু রঞ্জিকা’ পত্রিকা এবং অন্যান্য ধর্মীয় বই প্রকাশের সুবিধার্থে স্থাপন করা হয়েছিল।
রাজশাহীর প্রথম ছাপাখানা হিসেবে পরিচিত ‘তমোঘ্ন যন্ত্রালয়’ প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দুবলহাটির জমিদার রাজা হরনাথ রায় চৌধুরীর। তার আর্থিক সহায়তায় ছাপাখানাটি স্থাপিত হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
উনিশ শতকে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করা ছিল নিছক ব্যবসায়িক উদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। সংবাদপত্র, বই ও অন্যান্য মুদ্রিত উপকরণ প্রকাশের জন্য এমন প্রতিষ্ঠান ছিল জ্ঞানচর্চা ও তথ্যপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ‘তমোঘ্ন যন্ত্রালয়’ সেই বিবেচনায় রাজশাহীর ইতিহাসে বিশেষ স্থান পাওয়ার দাবি রাখে।
রাজশাহী ধর্মসভার সদস্য ও বরেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ রণজিৎ কুমার সাহা জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ধর্মসভার। এই প্রতিষ্ঠানকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজশাহীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের স্মৃতি। সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ পরিচিতি ও সংরক্ষণ প্রয়োজন।
আশির দশকে ছাপাখানাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কল্পনা রায়। তিনি তৎকালীন সময়ে ‘তমোঘ্ন যন্ত্রালয়’-এর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজশাহীর মুদ্রণশিল্পের শুরুর দিককার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। তিনি বলেন, ধর্মসভায় এ অঞ্চলের দরিদ্র হিন্দু শিক্ষার্থীরা একরকম বিনা পয়সায় থাকার সুযোগ পেতেন। ধর্মসভার খরচ মেটানোর জন্যই ছাপাখানার যন্ত্র উপহার পাওয়া যায়। ওটি খুব দামি মেশিন ছিল; কিন্তু ধীরে অফসেট এসে পড়ায় এর গুরুত্ব হারিয়ে যায়।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঐতিহাসিক রাজশাহী ধর্মসভা পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শন ঐতিহাসিক স্থানটির গুরুত্ব তুলে ধরার একটি সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা— প্রধানমন্ত্রীর সফর কেবল আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং রাজশাহী ধর্মসভার ইতিহাস ও স্থাপত্য ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পথ তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ধর্মসভার পুরনো মন্দিরটি আগের নকশা অনুসরণ করে পুনঃনির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।