৭০০ বছরের প্রাচীন খুলি আবিষ্কার: পরকীয়ার শাস্তি ছিল নারীর নাককাটা
চীনের একটি সমাধিক্ষেত্র থেকে ৭০০ বছর আগের এক নারীর মাথার খুলি আবিষ্কৃত হয়েছে। নতুন এক গবেষণা অনুয়ায়ী, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে শাস্তি হিসেবে নাক কেটে ফেলা বিশ্বের প্রথম প্রমাণ এটি! নির্মম এই শাস্তি দেওয়ার পরও বেঁচে ছিলেন মধ্যবয়সি ওই নারী। চুরি কিংবা পরকীয়ার অপরাধে তাকে এই শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন-নৃতত্ত্ববিদ, গবেষণার সহ-লেখক কিয়ান ওয়াং ই-মেইলে লাইভ সায়েন্সকে বলেন, “আমাদের ধারণা, মৃত্যুর পরও এই নারীকে একধরনের পরিত্যক্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তাকে উপুড় করে সমাহিত করা হয়েছিল, যা তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ইঙ্গিত। পরিবারের সদস্য কিংবা সম্প্রদায়ের অন্যদের থেকে তাকে বিচ্ছিন্নভাবে একটি স্থানে সমাহিত করার সিদ্ধান্তের পেছনে অবজ্ঞার মনোভাব কাজ করে থাকতে পারে।”
ওয়াং ও তার সহকর্মীদের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় হেনান প্রদেশের সানঝিউয়ান সমাধিক্ষেত্রে খননকাজ চালানোর সময় আরো ৩০০টি কঙ্কালের সঙ্গে ওই নারীর কঙ্কালটি আবিষ্কৃত হয়। গবেষণাপত্রটি জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স: রিপোর্টস সাময়িকীর নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
একটি কাঠের কফিনে উপুড় করে সমাহিত করা হয়েছিল ওই নারীকে। সমাধিক্ষেত্রের দক্ষিণ প্রান্তে তার কবরে পাওয়া যায়—তামার একটি চুলের কাঁটা। রেডিওকার্বন পরীক্ষায় জানা যায়, ১২৯৮ থেকে ১৪০৪ সালের মধ্যে জীবিত ছিলেন ওই নারী। এই সময়কাল চীনের ইউয়ান রাজবংশ অথবা মিং রাজবংশের শুরুর দিকের সঙ্গে মিলে যায়।
মূল নির্মাণকাজ শুরুর আগে দ্রুত খননকাজ চালানো হয়েছিল বলে অনন্য এই খুলির গুরুত্ব তখন শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ২০২৪ সালে ঝেংঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ইয়াওয়ে ঝৌ সমাধিক্ষেত্র থেকে পাওয়া কঙ্কালগুলো বিশ্লেষণ করার সময় প্রথম খুলিটিকে নাক কেটে শাস্তি দেওয়ার সম্ভাব্য নিদর্শন হিসেবে শনাক্ত করেন।
গবেষণাপত্রে গবেষকরা লিখেছেন, খুলিটির সবচেয়ে স্পষ্ট অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ছিল নাকের ছিদ্রের চারপাশের হাড়ের খোলা অংশটি স্বাভাবিকের তুলনায় বড় হওয়া। শারীরস্থানবিদ্যা এই অংশকে বলা হয়—‘পিরিফর্ম অ্যাপারচার’।
গবেষকরা লক্ষ্য করেন, নারীটির নাকের দুটি হাড় আংশিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছিল। ফলে নাকের সেতুর অর্ধেক অংশ অবশিষ্ট ছিল। আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নাকের ভেতরের কয়েকটি হাড়ও ভাঙা ছিল এবং সেগুলোর প্রান্তে ক্ষত সেরে ওঠার চিহ্ন রয়েছে। এসব আঘাতের কারণে নারীর মুখের মাঝের অংশটি ‘গর্তের মতো বসে যাওয়া’ বা ফাঁপা দেখাত।
অন্য যে কোনো রোগ কিংবা জন্মগত ত্রুটির কারণেও নারীর মুখমণ্ডলে এই বিকৃতি ঘটে থাকতে পারে—এ বিষয়টিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি গবেষকরা। তবে অস্বাভাবিকভাবে উপুড় করে সমাহিত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গবেষকরা সিদ্ধান্ত নেন যে, অপরাধের শাস্তি হিসেবে নাক কেটে ফেলার ঘটনাই অধিক সম্ভাব্য!
কিয়ান ওয়াং বলেন, “প্রাচীন চীনের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে গবাদিপশু, যেমন: গরু ও গাধা চুরির ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। তবে এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। যেমন: পরকীয়া। ইউয়ান রাজবংশের শেষ দিকে এ ধরনের গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে নাক কেটে ফেলা হতো।”
শাস্তি হিসেবে নাক কেটে ফেলার প্রথা সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জানেন, কারণ প্রাচীন চীনের ওরাকল বোন লিপিতে এই শাস্তির তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১০৪৬ সাল পর্যন্ত স্থায়ী শাং রাজবংশের সময় চীনা অক্ষরে এই শাস্তিকে নাকের বাঁ পাশে অথবা ডান পাশে ছুরির প্রতীক দিয়ে চিত্রিত করা হতো।
কিয়ান ওয়াং বলেন, “এই আবিষ্কার আমাকে বিস্মিত করেছে। কারণ এখন পর্যন্ত প্রত্নতাত্ত্বিক কঙ্কালে শাস্তি হিসেবে নাক কেটে ফেলার কোনো ঘটনার বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন বা বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই।”
রাজবংশীয় শাসনামলের পাঁচটি শাস্তির কথা স্মরণ করে কিয়ান ওয়াং বলেন, “প্রাচীন চীনের রাজবংশীয় শাসনের শুরুর দিকে অ্যানেসথেশিয়া ছাড়াই নাক কেটে ফেলা ছিল ‘পাঁচটি শাস্তি’-এর একটি। অন্য চারটি শাস্তি ছিল—শরীরে উল্কি বা দাগ কেটে দেওয়া, পায়ের অঙ্গচ্ছেদ, খোজা করে দেওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড। ফলে ইতিহাসে এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।”
সেই সময়ে চুরির মতো অপরাধের বিষয়ে কিয়ান ওয়াং বলেন, “সমাজের যেকোনো শ্রেণির মানুষ গবাদিপশু চুরির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ত। দারিদ্র্য কিংবা দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষার মতো নানা কারণে মানুষ এ ধরনের অপরাধ করতে বাধ্য হতে পারেন।”
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রিভারসাইড ক্যাম্পাসের জীবপ্রত্নতত্ত্ববিদ এলিজাবেথ বার্জার। এই গবেষণার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না। ই-মেইলে লাইভ সায়েন্সকে এলিজাবেথ বলেন, “নারীর মুখমণ্ডলের বিকৃতির কারণ হিসেবে শাস্তিমূলক নাককাটার বিষয়টি গবেষণায় যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এলিজাবেথ বার্জার বলেন, “এই ঘটনাটিকে ভিত্তি করে গবেষকরা এখন এ ধরনের আরো নিদর্শন খুঁজতে পারেন। আশা করি, ভবিষ্যতে আরো প্রমাণ পাওয়া যাবে। কারা এই শাস্তির শিকার হতেন, কীভাবে শাস্তি কার্যকর করা হতো এবং পরবর্তীতে তাদের চিকিৎসা কীভাবে করা হতো ইত্যাদি বিষয় আরকি। এর মধ্যে কৃত্রিম নাক বা অন্যান্য প্রতিস্থাপনমূলক উপকরণের ব্যবহারও অন্তর্ভুক্ত।”
সানঝিউয়ান সমাধিক্ষেত্র থেকে পাওয়া অস্বাভাবিক এই খুলি ‘গ্লোবাল হিস্ট্রি অব হেলথ প্রজেক্ট’-এর এশিয়া মডিউলের আওতায় পরীক্ষা করা হয়েছে। এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন কিয়ান ওয়াং। তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে আরো অনেক কঙ্কাল রোগ ও আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা করা হবে। আশা করি, ভবিষ্যতে একই ধরনের আরো নিদর্শন পাওয়া যাবে, যেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট আরো স্পষ্ট হবে।”
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি