একদল পয়সা দিচ্ছে, আরেকদল দেশে অস্থিরতা তৈরি করছে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একদল পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেক দল দেশে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখান থেকে অর্থ সরবরাহ করছে। একটি দল আছে যারা দেশের মধ্যে ভ্রান্তি ছড়ায়, যারা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে মিথ্যে কথা বলে বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল; এই দুই পক্ষ এক হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে (হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ) আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ষড়যন্ত্র রুখতে ঐক্যের ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময়েও যখনই তারা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের কাজে হাত দিয়েছিলেন, তখনই দেশি-বিদেশি কুচক্রি মহল ষড়যন্ত্র করে গতিরোধ করার চেষ্টা করেছে। সেই মহল আবার সজাগ হয়ে দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তাই উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
দেশবাসীকে সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ সময় এসেছে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন হবার। আজ থেকে আমাদের সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ বাংলাদেশে আর কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে; বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এটিকে যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।
রাজপথে বিশৃঙ্খলাকারীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমরা বিএনপি সরকার দেশে স্থিতিশীলতা আনতে ও নিরাপত্তা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। আমরা দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিয়ে বন্ধ কলকারখানাগুলো চালু ও বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হয় এবং উৎপাদিত পণ্য বিদেশে যেতে পারে। কিন্তু এই কাজগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করতে একটি বিশেষ দল আরও কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। তারা সরকারের জনবান্ধব কাজগুলোকে ধীর করে দিতে চাইছে। যারা এমন কর্মসূচি নেয় যাতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা জনগণের বন্ধু হতে পারে না।
একাত্তর ও চব্বিশের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার আগে শত শত ছাত্র ও সাধারণ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে গিয়েছিল। বিএনপি একুশ, একাত্তর ও চব্বিশকে ধারণ করে বলেই শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। গতকাল (সোমবার) সেই শহীদদের স্মরণে আমরা ঢাকার ওসমানী উদ্যানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছি। যারা মুখে চব্বিশকে ধারণ করার কথা বলে, এমন সব রাজনৈতিক দলকে আমরা দাওয়াত দিয়েছিলাম। কিন্তু জুলাই শহীদদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সেই দলগুলোর কোনো প্রতিনিধি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। অর্থাৎ ১৯৭১ সালে তারা যেভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে, ঠিক একইভাবে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তারা ধোঁকা দিয়েছে। তাদের মুখে এক কথা, আর কর্মে আরেক প্রতিফলন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাজশাহীতে পদ্মা নদী আছে। আমরা দেখেছি কীভাবে পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেই জন্যই আমরা সিদ্ধান্ত করেছি- বাংলাদেশের দুটি বড় নদীর একটি হচ্ছে তিস্তা, আরেকটি হচ্ছে রাজশাহীতে পদ্মা নদী। এই দুটি নদীতে আমরা ব্যারাজ তৈরি করব। যাতে করে আমাদের পানির সমস্যা আমরা দূর করতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে তাদের সাথে আমরা কথা বলব। দরকার হলে বাংলাদেশের মানুষের পানির হিস্যা আদায় করার জন্য যতদূর আমাদেরকে যেতে হয় আমরা যাবো। ইনশআল্লাহ বাংলাদেশের পানির হিস্যা আমরা নিয়ে আসার চেষ্টা করব। আমরা এই পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা ব্যারাজের কাজ শুরু করব এবং শেষও করব ইনশআল্লাহ।
তিনি বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে প্রায় ৪ হাজারের কাছাকাছি আখচাষি ভাইদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছি। যাতে করে আগামী সিজনে আখ চাষিদের কিছুটা হলেও কষ্ট কম হয়। বিএনপি বিশ্বাস করে এই দেশের কৃষক বাঁচলে এই দেশের কৃষি বাঁচবে। বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হয়েছে। বিএনপির অনেকগুলোর পরিকল্পনা বা অনেকগুলো প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি ছিল কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানো। বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষক ভাইদের যাদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ আছে সেই কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করবে। সরকার গঠনের সাত দিনের মাথায় আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রেখেছিলাম। সমগ্র বাংলাদেশের ১৩ লাখ কৃষক ভাইদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আমরা মওকুফ করে দিয়েছিলাম সুদসহ।
কৃষি কার্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কৃষক ভাইদেরকে একটি কার্ড দিতে চাই- যেটির নাম হচ্ছে ফার্মারস কার্ড বা কৃষক কার্ড। এরই মধ্যে এর কাজ শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষক, মাঝারি কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন কৃষক, বড় কৃষকের এই লিস্ট তৈরি করার কাজ এগিয়ে চলেছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে এটার কাজ শেষ হবে। তখন ধীরে ধীরে আমরা কৃষক ভাইদের কাছে সেই কার্ডগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা করব। এই বছর সমগ্র বাংলাদেশে আমরা ভূমিহীন প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষক নারী-পুরুষ ৪০ লাখ কৃষক ভাইয়ের কাছে আমরা কৃষি কার্ড পৌঁছে দেব।
তিনি বলেন, এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কোনো কৃষক যদি বছরে দুইটি ফসল উৎপাদন করে, কোনো কৃষক যদি বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন করে, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে চেষ্টা করব অন্তত একটি ফসলের সার, বীজ, কীটনাশক যতটুকু সম্ভব পৌঁছে দেওয়া হবে। কিছুটা হলেও তার কষ্ট লাঘব হবে। শুধু তাই নয়, এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনি যেরকম আপনার ক্ষেতের ফসলের বীমা করতে পারবেন। একইভাবে আপনি যদি ব্যাংক ঋণগ্রহণ করতে চান তাহলে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনি সহজেই সেই ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন।
তারেক রহমান বলেন, সমগ্র দেশে আমরা আবার খাল খনন এবং নদী সংস্কার বা নদী খনন কর্মসূচি শুরু করব। আল্লাহর রহমতে আমরা সেই কাজও শুরু করেছি। আগামী পাঁচ বছর আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করব। এর মধ্যে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার খাল গত আট মাসে আমরা খনন কার্য সম্পন্ন করেছি। এই কাজ করার মাধ্যমে একদিকে যেরকম কৃষক ভাইয়েরা পানির সুবিধা পাবে। সেচের সুবিধা পাবে। রাজশাহীর মানুষ জানে কিভাবে এখানকার ভূগর্ভস্থ পানি কত নিচে নেমে গিয়েছে। বহু মানুষের সেই জন্য পানির কষ্ট সেই পানিও ধীরে ধীরে আবার রিচার্জ হবে এখানে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে ১৩০০ শয্যা রয়েছে। এটি ২৫০০ হবে। বিএনপি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রত্যেকটি উপজেলায় যে হাসপাতাল আছে এটির বেড সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে ৫০ বেড। এবার যেহেতু জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপিকে বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত করেছে সেজন্যই আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি প্রত্যেকটা উপজেলা হাসপাতাল ৫০ বেড থেকে আমরা ১৫০ বেডের হাসপাতালে তৈরি করব। যাতে করে গ্রামের মানুষ অল্পস্বল্প অসুখে কষ্ট করে দূরের সদর হাসপাতালে না যেতে হয়।
তিনি বলেন, বিএনপি চাইছে বেকারত্বের যে অভিশাপ সেটি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে। কিন্তু আমরা দেখেছি কতগুলো মানুষ, একটি বিশেষ দল, কতগুলো দলকে সাথে নিয়ে তারা রাস্তায়-রাজপথের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছে। আমরা দেশি উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহ দিয়ে আনার চেষ্টা করছি, যে কীভাবে বন্ধ কল কারখানাগুলো চালু করা যায়। যাতে করে বাংলাদেশের বেকার শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু এই সকল কাজকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য আমরা কতগুলো দল উঠে পড়ে লেগেছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করছে।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন। সভায় বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন শওকত, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও বিএমডিএর চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরিফ উদ্দিন। এছাড়াও মঞ্চে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জনসভা পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন।