বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬

মণ্ডপে মণ্ডপে সিঁদুর খেলা, ঢাকের বাদ্যে দুর্গার বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক ২১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫০ অপরাহ্ন
মণ্ডপে মণ্ডপে সিঁদুর খেলা, ঢাকের বাদ্যে দুর্গার বিদায়

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখর পূজামণ্ডপ। কোথাও দেবীর চরণে শেষ অঞ্জলি, কোথাও সিঁদুর খেলায় মাতোয়ারা নারীরা। হাসি-আনন্দের মুহূর্তেও চোখে বিদায়ের বিষাদ। উৎসবের রঙ আর দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনা মিলেমিশে একাকার। এমন আবেগঘন পরিবেশে বুধবার বিজয়া দশমীতে রাজশাহীতে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে নগরীর ফুতকিপাড়া এলাকায় পদ্মার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনের আয়োজন।


বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের সমাগম বাড়তে থাকে। দেবীর দশমী বিহিত পূজা, অঞ্জলি ও ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। দেবীর কাছে মঙ্গল, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন ভক্তরা। এরপর বিবাহিত নারীরা মেতে ওঠেন ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলায়। ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ।


নগরীর ষষ্ঠীতলা আদি কালিস্থান দুর্গামন্দিরে সকাল থেকেই ভিড় করেন শত শত নারী। তাদের বরণের থালায় ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি। একে একে দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন তাঁরা। দেবীর মুখে ছুঁইয়ে দেন মিষ্টি। এরপর একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে ভাগ করে নেন উৎসবের আনন্দ। নাচে-গানে আর দেবীর জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ।


রাজশাহী ধর্মসভা মন্দিরের পুরোহিত বিদ্যুৎ কুমার মজুমদার জানান, বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৫ মিনিটে দেবী দুর্গার দশমী বিহিত পূজা শুরু হয়। ধর্মীয় আচার শেষে দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। ভক্তরা দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। সিঁদুর খেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সনাতন ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী বিবাহিত নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় দেবীকে সিঁদুর নিবেদন করেন এবং পরস্পরের মধ্যে সিঁদুর বিনিময় করেন।


বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার পর বিভিন্ন মণ্ডপে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। নগরীর নবরূপ পূজামণ্ডপেও বেলা ১১টার দিকে হাজারো ভক্তের সমাগম ঘটে। একদিকে চলছিল বিদায়ী আরতি ও শেষ অঞ্জলি, অন্যদিকে মাঠে নাচে-গানে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা। নারীদের পাশাপাশি পুরুষ, তরুণ ও শিশুরাও অংশ নেন উৎসবের আয়োজনে। অনেক স্বামীকে স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে সংসারের মঙ্গল কামনা করতে দেখা যায়। তবে আনন্দের মধ্যেও দেবীর বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের চোখে ছিল বিষাদের ছায়া।


রাজশাহী মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক বিশ্বনাথ সরকার বলেন, রাজশাহীতে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের দুর্গাপূজা সম্পন্ন হয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে পূজার আয়োজন করায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। সনাতন ধর্মাবলম্বী পল্লব কুমার শাহ বলেন, ‘এক বছর পর মা আমাদের মাঝে এসেছেন। আজ আবার তিনি চলে যাচ্ছেন। আমাদের চাওয়া, পৃথিবীর সব অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, শুভ শক্তির উদয় হোক। এর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে শান্তি ফিরে আসুক।’


বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে নগরীর ফুতকিপাড়া পদ্মার ঘাটে শুরু হয় প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন। ভক্তরা দেবীকে সাত পাক ঘুরিয়ে নৌকায় তোলেন। এরপর নৌকায় পদ্মার বুকে নিয়ে গিয়ে অশ্রুসজল চোখে প্রতিমা বিসর্জন দেন তাঁরা। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে ঘাট এলাকা। পদ্মার জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।


বিদায়বেলায় ধর্মীয় সম্প্রীতির কথাও তুলে ধরেন আয়োজকেরা। নগরীর টাইগার সংঘ পূজামণ্ডপের সাধারণ সম্পাদক পার্থ পাল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অনেক খুশি। প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীতে এসে আমাদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। রাজশাহীর মানুষ সবাই মিলেমিশে থাকেন। এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারছেন।’


দুর্গোৎসব ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. গাজিউর রহমান জানান, পূজামণ্ডপগুলো ঘিরে বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।


সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের সূচনা হয়। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসব। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীকে এক বছরের জন্য বিদায় জানান ভক্তরা। বিশ্বাস অনুযায়ী, পুত্র-কন্যাদের নিয়ে দেবী ফিরে যান কৈলাসে। রেখে যান আনন্দ, স্মৃতি আর আবার ফিরে আসার প্রত্যাশা। পদ্মার জলে প্রতিমা বিলীন হলেও ভক্তদের মনে রয়ে গেছে উৎসবের রেশ—আগামী শরতে আবারও আসবেন মা দুর্গা, ফিরে আসবে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর মিলনমেলার আনন্দ।