৩৭ জন শিক্ষক-কর্মচারীর কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ৪৬, সবাই ফেল
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার তছলিম উদ্দিন তরফদার ডিগ্রি কলেজে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৬ জন শিক্ষার্থীর একজনও পাস করতে পারেননি। ৩৭ জন শিক্ষক-কর্মচারী সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ এমপিওভুক্ত কলেজ থেকে এমন নজিরবিহীন শতভাগ ফেলের ঘটনায় পুরো জেলায় আলোচনা শুরু হয়েছে।
ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ কোন্দল, শিক্ষকদের গ্রুপিং এবং ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসমুখী না হওয়ার প্রবণতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে এলাকাবাসীর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটিতে দীর্ঘদিন ধরে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষের পদ নিয়ে নানামুখী বিরোধ চলে আসছে। এই দ্বন্দ্বের জেরে শিক্ষকরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ম্যানেজিং কমিটি নিয়ে বিরোধ ও শিক্ষকদের দলাদলির কারণেই এই ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে। এতে কলেজটির দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
বর্তমান অধ্যক্ষ জহুরুল ইসলাম কামাল বলেন, স্থানীয়ভাবে কলেজটিকে নিয়ে চলা বিরোধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। কারণ, এই কোন্দলের কারণে শিক্ষকরা ক্লাসে নিয়মিত ও পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারেননি।
কলেজটির প্রধান অফিস সহকারী ফজলুল বারী জানান, এই প্রতিষ্ঠানে সাধারণত অন্য কলেজে সুযোগ না পাওয়া তুলনামূলক কম মেধাবী বা ‘সি’ ও ‘ডি’ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন। শিক্ষকরা তাদের নার্সিং করে এতদিন কোনোমতে ভালো ফলাফল টিকিয়ে রাখলেও এবারের এমন বিপর্যয় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল।
কম্পিউটার অপারেটর তাজমিন আক্তার সেতু জানান, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসতেন না। অভিভাবকদের ফোন করা হলে তারা বলতেন, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গেছে। আবার আসলে পাঠাতে দিচ্ছে না। পরীক্ষার দিনগুলোতেও দেখা গেছে, প্রথম দিন ১৫ জন উপস্থিত থাকলেও পরে কমতে কমতে তা কয়েকজনে ঠেকে এবং শেষের দিকে কেউ আর উপস্থিত থাকতেন না। মূলত ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন।
মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত আসলেও ছাত্র-ছাত্রীদের সঠিকভাবে ক্লাসে উপস্থিত করা যায়নি। ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়াই আজকের এই পরিস্থিতির মূল কারণ।
প্রতিষ্ঠানের এমন করুণ দশায় হতবাক এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা। ক্ষুব্ধ অভিভাবক শহীদুল ইসলাম বলেন, এত সুন্দর একটি কলেজ, অথচ আজকে এমন বিপর্যয় নেমে এলো! আমরা গরিব মানুষ, সন্তানদের বগুড়া শহরে গিয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের ভরসাস্থল ছিল। কিন্তু কমিটি ও শিক্ষকদের গাফিলতিতে যদি পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের ছেলেমেয়েরা কোথায় যাবে?
স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহ সুলতান বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে এখানে অযোগ্য নেতৃত্ব ও অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। সভাপতি ঢাকায় থাকায় কলেজ বা শিক্ষার কোনো খোঁজ রাখতে পারেননি। শিক্ষকরা এসে সই করে চলে গেছেন, পড়াশোনা হয়নি বললেই চলে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বগুড়া জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী আকন্দ তাৎক্ষণিক কলেজটি পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে দীর্ঘ এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জরুরি মতবিনিময় সভা করেন। জেলা শিক্ষা অফিসার জানান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী না হওয়া এবং অভিভাবকদের চরম উদাসীনতার কারণেই এই বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে নিয়মিত উপস্থিত থাকলেও তদারকিতে কিছুটা ঘাটতি ছিল।
তিনি আরও বলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় সম্পূরক পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা যেন সহজে উতরে যেতে পারেন, সেজন্য এখন থেকেই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামীকাল থেকেই লেকচার পদ্ধতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সামনে বসিয়ে সরাসরি ডিসকাশন ও প্রাইভেট কেয়ারের আদলে বিশেষ ক্লাস নেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, অভিভাবকদের সঙ্গে দ্রুত সভা করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে পাঠানোর বিষয়ে অঙ্গীকার নেওয়া হবে।
তছলিম উদ্দিন তরফদার কলেজের পাশাপাশি বগুড়া জেলায় আরও চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবার শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এমপিওভুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- গাবতলীর বাগবাড়ি মডেল মহিলা কলেজ থেকে ৩ জন অংশ নিয়ে সবাই ফেল, ধুনটের গোসাইবাড়ি মহিলা কলেজ থেকে ২ জন অংশ নিয়ে সবাই ফেল, কাহালুর দুর্গাপুর আইডিয়াল মহিলা কলেজ থেকে ২ জন অংশ নিয়ে সবাই ফেল এবং আল্লামার তাকিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে একজন অংশ নিয়ে ফেল।
গোসাইবাড়ি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম ও আল্লামার তাকিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ ফেরদৌস আলম জানান, দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদানে নিজেদের নিবেদিত রাখতে পারছেন না।
তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ