শুক্রবার, নভেম্বর ০৬, ২০২৬

মহাস্থান হাটে সবজির বাজারে ধস, উৎপাদন খরচ না উঠায় লোকসানের মুখে কৃষক

দীপক সরকার, বগুড়া: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ন কৃষি
দীপক সরকার, বগুড়া: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১২:২৫ অপরাহ্ন
মহাস্থান হাটে সবজির বাজারে ধস, উৎপাদন খরচ না উঠায় লোকসানের মুখে কৃষক

মাঠজুড়ে সবুজের সমারোহ, গাছে গাছে শীতকালীন সবজির ভালো ফলন। কৃষকের প্রত্যাশা ছিল, আগাম সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাবেন। কিন্তু ফলন ভালো হলেও সেই আনন্দ এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় বগুড়ার মহাস্থান হাটে দেখা দিয়েছে দরপতন।


উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি সবজির মোকাম বগুড়ার মহাস্থান হাটে এখন সবজির ছড়াছড়ি। প্রতিদিন শত শত কৃষক তাঁদের উৎপাদিত সবজি নিয়ে আসছেন এই হাটে। কিন্তু সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা ও পাইকারের উপস্থিতি কম থাকায় দর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। ফলে ক্ষেতের ফসল বাজারে তুলেও লাভের মুখ দেখছেন না কৃষকেরা। অনেককে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ না উঠিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।


জেলা কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বগুড়ায় প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে। অনুকূল পরিবেশে ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। মহাস্থান হাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। তবে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লেও সে অনুপাতে বাজারে চাহিদা না থাকায় তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি।


সরেজমিনে বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে মহাস্থান হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটের বিভিন্ন প্রান্তে সারি সারি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিমসহ নানা ধরনের শীতকালীন সবজি। সকাল থেকেই কৃষক, পাইকার, আড়তদার ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকলেও সবজির দাম নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চলছে দরকষাকষি। অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে বাধ্য হচ্ছেন কম দামে ফসল বিক্রি করতে।


হাটের পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা এবং ফুলকপি ১৫ থেকে ২০ টাকা দরে। চিচিঙ্গার দাম নেমে এসেছে কেজিপ্রতি মাত্র দুই টাকায়। এক সপ্তাহ আগে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া করলা এখন ৩০ টাকায়। একই সময়ে ৬০ টাকার ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। ৩০ টাকার মুলা নেমেছে ৭ টাকায় এবং ১৫০ টাকার শিম বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০ টাকা কেজি দরে।


এ ছাড়া পটল ৪০ টাকা থেকে কমে ১৫ টাকা, শসা ৫০ টাকা থেকে ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা থেকে ৩৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং বেগুন ১০০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে হাটের রবিবারের পাইকারি দর অনুযায়ী প্রতি কেজি গাজর ১১০ টাকা, টমেটো ৮০ টাকা, বেগুন ৩০ টাকা, মিষ্টি লাউ ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩০ টাকা, শসা ২৫ টাকা, আলু ২০ টাকা ও পেঁপে ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। প্রতি হালি লেবু ২০ টাকা এবং প্রতিটি বাঁধাকপি ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।


শুধু কম দাম নয়, সবজি বিক্রিতে ওজনের হিসাব নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে কৃষকদের। মোকামতলা এলাকা থেকে ফুলকপি নিয়ে আসা কৃষক নাসির উদ্দিন তারেক জানান, আগে ৪০ কেজিতে এক মণ হিসাব করা হলেও বর্তমানে হাটে এক মণ সবজি দিতে হচ্ছে ৪২ থেকে ৪৪ কেজি। অর্থাৎ প্রতি মণে অতিরিক্ত দুই থেকে চার কেজি সবজি দিতে হচ্ছে। এতে কম দামে বিক্রির পর ওজনের হিসাবেও কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার বিষয়ে রফিক নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কাঁচা সবজি পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় শুকিয়ে ওজন কমে যায়। সেই ঘাটতি পুষিয়ে নিতেই কিছুটা বেশি সবজি নেওয়া হয়।


মহাস্থানগড়ের পাইকারি সবজি বাজারের আড়তদার ও কৃষক রহেদুল ইসলাম জানান, তিনি নিজেও তিন বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছেন। কিন্তু প্রতিদিন বাজারে দাম কমতে থাকায় এবার তাঁর প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করছেন।


মোকামতলা উপজেলার শঙ্করপুর গ্রামের কৃষক জাহেদুর রহমান দুই মণ মুলা নিয়ে এসেছিলেন হাটে। কিন্তু বাজারে দাম এতটাই কম যে, বিক্রির অর্থ দিয়ে ভ্যানভাড়া ও শ্রমিকের মজুরিও মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত দেড় মণ মুলা বিক্রি করে বাকি মুলার ক্রেতা না পেয়ে সেগুলো রাস্তার পাশে ফেলে যেতে বাধ্য হন তিনি।

কৃষকদের ভাষ্য, জমি তৈরি, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা ও শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে সবজি উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। অথচ বাজারে এসে সেই ফসল বিক্রি করতে হচ্ছে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে। ক্ষেত থেকে সবজি তুলে বাজারে আনার পর তা বিক্রি না করে ফেরত নেওয়াও কঠিন। ফলে লোকসান জেনেও বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।


মহাস্থান হাটে কৃষকেরা যখন পানির দামে সবজি বিক্রি করছেন, তখন বগুড়া মহানগরের খুচরা বাজারে একই সবজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। মহানগরের ফতেহ আলী, রাজাবাজার, কলেজ বাজার, বিসিক কাঁচাবাজার ও মাটিডালী বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।


মহাস্থান হাটের ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই হাট থেকে সবজি কিনে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করছেন। কাঁচামালের ব্যবসায় লাভ-লোকসান দুটিই রয়েছে। কখনো লাভ হয়, আবার কখনো লোকসান গুনতে হয়।


ফতেহ আলী বাজারের ব্যবসায়ী শফিকুল জানান, মহাস্থান হাট থেকে সবজি কিনে শহরে আনতে পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। এ ছাড়া শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য ব্যয়ও যুক্ত হয়। এসব কারণে পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে দাম কিছুটা বেশি রাখতে হয়।


বগুড়া রাজাবাজার ব্যবসায়ী ও আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক পরিমল প্রসাদ রাজ বলেন, মোকামের তুলনায় খুচরা বাজারে সবজির দাম বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। কোনো সবজির সরবরাহ বাড়লে দাম কমে যায়, আবার সরবরাহ কমলে দাম বেড়ে যায়। তবে গত বছরের তুলনায় এবার আগাম শীতকালীন সবজির দাম কম রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।


সব মিলিয়ে বগুড়ার মহাস্থান হাটে আগাম শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন কৃষকের মুখে হাসি ফোটানোর বদলে নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ ও কম দাম—দুইয়ের চাপে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। অথচ পাইকারি বাজারে দরপতনের পুরো সুফল ভোক্তারা পাচ্ছেন না; খুচরা বাজারে এখনো তুলনামূলক বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে তাঁদের। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যবর্তী বাজারব্যবস্থায় এই দামের ব্যবধান এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।