ইসরায়েলে গদির পথে গাদি, কে এই আইজেনকোট?
ইসরায়েলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন গাদি আইজেনকোট। শনিবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এমন ঘোষণা দিয়েছেন। রোববার স্থানীয় সময় বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
আইজেনকোট রাজনৈতিক দল ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান। নেসেট নির্বাচনে দলটি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিরোধী জোটের নেতৃত্বে ছিল। সরকার গঠনের জন্য আইজেনকোট ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে আরও ১৪ দিন সময় দেওয়া হতে পারে। ব্যর্থ হলে পরবর্তী সুযোগ পাবেন নেতানিয়াহু।
কে এই আইজেনকোট?
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) নর্দার্ন কমান্ডের প্রধান ও উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আইজেনকোট। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইডিএফের প্রধান ছিলেন। তাঁর মেয়াদে সংযমের নীতি গুরুত্ব পায়। একের পর এক ছুরিকাঘাত ও সন্ত্রাসী হামলা সত্ত্বেও পশ্চিম তীরে তিনি সম্মিলিত শাস্তি নীতির বিরোধিতা করেন। পাশাপাশি সামরিক অভিযানে নির্ধারিত নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার পক্ষে ছিলেন।
আইজেনকোটের সামরিক কৌশলের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘ক্যাম্পেইন বিটুইন ওয়ারস’। এই নিরাপত্তা কৌশলের লক্ষ্য ছিল ছোট পরিসরে আগাম অভিযান চালিয়ে যুদ্ধ বিলম্বিত করা এবং শত্রুপক্ষকে নিরস্ত রাখা। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১৮ সালের একটি অভিযান। ওই অভিযানে হিজবুল্লাহর ওপর সরাসরি হামলা না চালিয়ে লেবানন থেকে ইসরায়েলে প্রবেশ করা সীমান্ত এলাকার সুড়ঙ্গ ধ্বংসের ওপর জোর দেওয়া হয়।
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট ২০২২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি প্রথমে বেনি গান্তজের মধ্যপন্থি ‘ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট’ পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে দলটি অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে মিলে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি গঠন করে। আইজেনকোট কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছাড়াই মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি পার্লামেন্টের কয়েকটি কমিটিতে যুক্ত ছিলেন, যার বেশিরভাগই নিরাপত্তাবিষয়ক।
গত বছর গান্তজের দল ছেড়ে দেন আইজেনকোট। এরপর নিজের নতুন দল ইয়াশার গঠন করেন। ন্যাশনাল ইউনিটি ও লেবার পার্টির কয়েকজন রাজনীতিক তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। তাদের মধ্যে অর্থ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ধর্মীয় সেবাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রীরা আছেন। তালিকায় আরও আছেন নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের একজন সাবেক কর্মকর্তা।
গাজা যুদ্ধে আইজেনকোট তাঁর ছেলে ও দুই ভাতিজাকে হারিয়েছেন। ২০২৩ সালে জিম্মি উদ্ধারের এক অভিযানে তাঁর ছেলে গাল নিহত হন।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবস্থান কী?
ইয়াশার পার্টির প্রধান নীতিগুলো নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। দলটির ১০ দফা পরিকল্পনায় হামাসের নেতৃত্বে ৭ অক্টোবরের হামলা তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে অতি-রক্ষণশীল ও আরব জনগোষ্ঠীসহ সব নাগরিকের জন্য সামরিক বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আছে। পাশাপাশি পরিকল্পনা ও কৌশলভিত্তিক নতুন প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য ইসরায়েলকে প্রধান আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করা।
দলটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ‘আমরা শান্তির পরিধি বাড়াতে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ইহুদিদের সুদৃঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে এবং বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। পাশাপাশি অতি-রক্ষণশীল হারেদি সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীসহ সব শিক্ষার্থীর জন্য গণিত, বিজ্ঞান ও ইতিহাসের মৌলিক পাঠ্যক্রম বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে।
ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে অবস্থান কী?
আইজেনকোট চান ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা হোক। এর বাইরে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তেমন কিছু বলা হয়নি। ইসরায়েলের ভেতরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি ও পশ্চিম তীরের বাসিন্দা- উভয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই তাঁর অবস্থান অস্পষ্ট।
গত জুন মাসে চ্যানেল টুয়েলভের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি নিজের অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেন। সেখানে তিনি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। বলেন, ‘দুই জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি রাষ্ট্রের কথা আমি কখনো বলিনি। কারণ, এই ধর্মীয়, জাতীয় ও সামাজিক সংঘাত কতটা গভীর, তা আমি বুঝি। যারা এখনই শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দুই রাষ্ট্রের কথা বলেন, তারা এই সংঘাত বোঝেন না।’
পশ্চিম তীরের বাইবেলীয় নাম ব্যবহার করে তিনি বলেন, ‘আমি জুডিয়া ও সামারিয়ায় বসতি স্থাপনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’ তবে এ ক্ষেত্রে দুটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন তিনি। প্রথমত, বসতি স্থাপন ইসরায়েল রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সেটি হতে হবে আইনসম্মত।
আইজেনকোট আরও বলেন, ‘যদি দুই জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা এক হয়ে যায়, অর্থাৎ নদী থেকে সাগর পর্যন্ত এলাকায় ৭৫ লাখ ইহুদি ও ৭৫ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করেন, তাহলে সেটি বড় ধরনের ঝুঁকি হবে।’
ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি আইডিএফ সেনাদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলাকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে মনে করেন আইজেনকোট। নির্বাচনের আগেও তিনি এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বলেন, ‘জুডিয়া ও সামারিয়ায় ইহুদি উগ্রপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা অপরাধমূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ।’
আইজেনকোটের ভাষায়, এ ধরনের সহিংসতা ইহুদি মূল্যবোধের পরিপন্থি। ইসরায়েলি সমাজকে দুর্বল করে, বিদেশে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।