রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

সাদ্দামের প্যারোলের আবেদন বাগেরহাটের ডিসির কাছে, পৌঁছায়নি যশোরে

সোনার দেশ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২০ পূর্বাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২০ পূর্বাহ্ন
সাদ্দামের প্যারোলের আবেদন বাগেরহাটের ডিসির কাছে, পৌঁছায়নি যশোরে

স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের পরিবার প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিল। স্বজনরা বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে আবেদন করলেও সেটি যশোরের জেলা প্রশাসকের কাছে পৌঁছায়নি। পরে ডিসির বাংলো থেকে স্বজনদের জানানো হয়, প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি অনুমোদন হয়নি। তাই পরিবারের সদস্যরা সাদ্দামের মৃত স্ত্রী-সন্তানের লাশ নিয়ে আসেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। শনিবার সন্ধ্যায় জেলগেটে স্ত্রী-সন্তানকে শেষবিদায় জানান সাদ্দাম। এ অবস্থায় তাকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।


শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও নয় মাসের শিশুসন্তান নাজিফের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সাদ্দাম বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তিনি ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি।


যশোর কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সব নিয়ম মেনে লাশ দুটি কারা ফটকে আনা হলে সাদ্দামকে সেখানে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় পর স্ত্রীকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখেন এবং প্রথমবারের মতো নিজের মৃত সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। এ সময় উপস্থিত কারারক্ষী ও স্বজনদের মধ্যে এক শোকাহত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।


সাদ্দামের স্বজনদের ভাষ্য

স্বজনদের দাবি, সাদ্দাম দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকায় তার স্ত্রী স্বর্ণালী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। স্বামীর মুক্তির কোনও পথ না পেয়ে চরম হতাশা থেকে প্রথমে শিশুকে পানির বালতিতে চুবিয়ে হত্যা করেন এবং পরে নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।


সাদ্দামের পরিবার জানায়, কারাবন্দি সাদ্দাম মাঝে-মধ্যে স্ত্রীকে চিরকুট পাঠিয়ে ধৈর্য ধরতে বলতেন এবং দ্রুত মুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিতেন। এসব বার্তা স্বর্ণালীর ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।


প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিল পরিবার

সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার যখন লাশ দুটি ঘর থেকে উদ্ধার হয়; তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই সাদ্দামকে শেষবারের মতো তার স্ত্রী-সন্তানকে দেখানোর। এরপর আমার মামা হেমায়েত উদ্দিন তার এক সহকর্মীকে নিয়ে যান বাগেরহাটের ডিসি অফিসে। ছুটির দিনে ডিসি অফিসে না থাকায় চলে যান ডিসির বাংলোতে। সেখানে ডিসিকে সব খুলে বলার পর সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির আবেদনপত্রটি দিই। এরপর আবেদনপত্রটির এক কপি আমাদের দিয়ে দেন বাংলোর এক কর্মকর্তা। তবে সেটিতে রিসিভ করার কোনও স্বাক্ষর ছিল না। স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলোর কর্মকর্তা জানান, কোনও সমস্যা হবে না। পরে বাংলো থেকে জানানো হয়, প্যারোল অনুমোদন হয়নি।’


তিনি বলেন, ‘আজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাগেরহাটের ডিসি বলেছেন, তিনি নাকি আমাদের বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেন, যশোরের ডিসি ও কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। আসলে ডিসি এ ধরনের কোনও কথা আমাদের বলেননি। তিনি এই পরামর্শটা দিলে তো আমরা যশোরে যোগাযোগ করতাম। শেষমেশ আমরা নিজেরাই যশোরের জেলারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে কারা ফটকে কয়েক মিনিটের জন্য ভাইকে তার স্ত্রী-সন্তানকে দেখার অনুমতি দিলো যশোর কারা কর্তৃপক্ষ। আমরা তো এসব প্রক্রিয়া বুঝি না।’


প্যারোলে মুক্তির আবেদনপত্রে আবেদনকারী হিসেবে স্বাক্ষর আছে সাদ্দামের মামা মো. হেমায়েত উদ্দিনের। এ ব্যাপারে হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘২৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর প্যারোলে মুক্তির জন্য লিখিত আবেদন করি। জেলা প্রশাসক আবেদনের এক কপি রেখে আরেক কপি আমাদের দিয়ে বাগেরহাট জেলা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার কোনও এখতিয়ার তাদের নেই। আইন অনুযায়ী যে কারাগারে আসামি বন্দি, সেখানেই আবেদন করতে বলা হয়। পরে কোনও উপায় না পেয়ে যশোর কারাগারে লাশ নিয়ে গেলে মাত্র তিন মিনিটের জন্য দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।’


কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ভাই  শুভ বলেন, ‘স্বামী কারাবন্দি থাকায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল আমার বোন। মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। তবে অন্য কিছুও থাকতে পারে। এ জন্য প্রশাসনের কাছে ঘটনা তদন্তের দাবি জানাই।’


তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেটারে আমার দুলাভাই একবারও কোলে নিতে পারেনি। শেষবারের জন্য যেন একটু দেখতে পারে, তাই কারা ফটকে নিয়ে গিয়েছিলাম।’


যা বলছেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক

স্ত্রী-সন্তানের জানাজায় যেতে সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনা। এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে আসছিল তার পরিবার। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু আসামি আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। এখানকার (বাগেরহাটের) প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দরভাবে, সঠিকভাবে মৃত স্বজনদের লাশ দেখতে পারে আসামি। আমরা তাদের সেখানে যাওয়া এবং দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছিলাম।’


যশোরের জেলা প্রশাসক বলছেন আবেদন করেনি পরিবার

সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির আবেদন সংক্রান্ত সংবাদে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে যশোর জেলা প্রশাসন। রবিবার জেলা প্রশাসকের মিডিয়া সেলের সহকারী কমিশনার আশীষ কুমার দাস স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্যারোলে মুক্তির আবেদন বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাগেরহাট কারাগার থেকে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আগত বন্দি জুয়েল হাসান সাদ্দাম নামক ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর কিংবা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ বরাবর প্যারোলে মুক্তির কোনও ধরনের আবেদন করা হয়নি। বরং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পরিবারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সময় স্বল্পতার কারণে তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্তে প্যারোলে মুক্তির আবেদন না করে জেলগেটে লাশ দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে উল্লেখিত বন্দির স্ত্রীকে লিখিত চিঠি, কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছবি দেখা যাচ্ছে, যা যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। এ ছাড়া আবেদনের পরও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, এ ধরনের তথ্যও মিথ্যা। কারণ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, যশোর বরাবর প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত কোনও আবেদন করা হয়নি। বরং পরিবারের মৌখিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে মানবিক দিক বিবেচনায় কারাফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করেছিল।’


সাদ্দামের পরিবারের আবেদনের বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক কিংবা কেউ কোনও ধরনের যোগাযোগ করেছিল কিনা জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্যারোলে মুক্তির কোনও আবেদন আমরা পাইনি। বাগেরহাট থেকে এ নিয়ে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। জেলা প্রশাসনের কারও সঙ্গেও কোনও কথা হয়নি।’


আইনি ব্যাখ্যা কী

এ বিষয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আবিদ আহম্মেদ বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী বন্দি যে কারাগারে আছে, সেই জেলার জেলা প্রশাসকের কাছে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করতে হয়। আমার জানামতে, যশোরের জেলা প্রশাসক ও আমাদের কাছে সাদ্দামের স্বজনরা কোনও আবেদন করেননি। তবে স্বজনরা মোবাইলে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তাদের বলেছিলাম, প্যারোলে জামিন না হলে কারা ফটকে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত যেকোনও বন্দির স্বজন মারা গেলে; কারা ফটকে এলে মানবিক দিক বিবেচনা করে মরদেহ দেখিয়ে দিই আমরা। সেটিই সাদ্দামের ক্ষেত্রে করা হয়েছে।’ 


যশোর জজ কোর্টের আইনজীবী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, ‘কারাগারে বন্দি থাকাকালীন কোনও বন্দির নিকট আত্মীয় স্বজন মারা গেলে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আবেদন করে প্যারোলে মুক্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু যশোরে কারাগারে যা ঘটে গেলো সেটা আইনগতভাবে বন্দির অধিকার লঙ্ঘন করেছে কর্তৃপক্ষ। এটা নিঃসন্দেহ অন্যায় হয়েছে।’


যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘প্যারোলে মুক্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। শুনেছি বন্দির স্বজনরা আবেদনই করেননি। তাহলে কীভাবে মুক্তি পাবেন বন্দি।’


দায় কার, প্রশ্ন সাদ্দামের আইনজীবীর

জুয়েল হোসেন সাদ্দামের আইনজীবী তাজিনুর রহমান পলাশ বলেন, ‘আজকে দেখলাম যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হয় নাই। এই সংবাদটা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যথাযথভাবে আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের শেষ অংশে উল্লেখ রয়েছে আসামি যশোর জেলা কারাগারে রয়েছে। বাগেরহাট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে যশোরের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এই কপি ফরোয়ার্ড করে আসামির প্যারোলে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। যশোর কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা আবেদন পান নাই। এখানে ভুক্তভোগী পরিবারের অপরাধ কী? তাছাড়া বাগেরহাটের মামলায় আসামি গ্রেফতার, কী কারণে যশোর কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে? সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। পরিবার তো বাগেরহাটেই আবেদন করবেন। পরিবারের অজ্ঞতা থাকতে পারে। কিন্তু সময় স্বল্পতার যে কথা বলা হয়েছে, তা সঠিক নয়। বাগেরহাট থেকে লাশ যশোর কারাগারে নিতে যে সময় লাগবে, যশোর থেকে সাদ্দামকে আনতে তার চেয়ে বেশি সময় লাগার কথা নয়। বরং লাশ যশোরে নেওয়ার কারণে যশোর থেকে ফেরত এসে দাফন দিতে বিলম্ব হয়েছে। এই দায় কার, সরকারের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে প্যারোলের ব্যবস্থা কি করতে পারতেন না?’


পারিবারিক কবরস্থানে দাফন

এদিকে জানাজা শেষে বাগেরহাটের পারিবারিক কবরস্থানে কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী (২২) ও তার ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তানের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার রাত ১২টার দিকে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের বাবার বাড়ির কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় মা-ছেলেকে। এর আগে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে রাত ১১টা ২০ মিনিটে জানাজা হয়। গত শুক্রবার দুপুরে সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের স্বামীর বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত লাশ এবং ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।


তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন