পবিত্র শবে বরাত আত্মশুদ্ধির রজনী
আজ পবিত্র শবে বরাত। ফারসি ‘শব’ শব্দের অর্থ রাত আর ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি। আজ সেই মুক্তির রাত বা ‘লাইলাতুল বরাত’। তবে হাদিসের পরিভাষায় এই রাত পরিচিত ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’—অর্থাৎ মধ্য-শাবানের রজনী নামে।
হিজরি সনের শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে সৌভাগ্যের রাত হিসেবে পরিচিত। এই রাতে বান্দাদের জন্য অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন মহান আল্লাহ তাআলা।
মহিমান্বিত এই রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পরম করুণাময় মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে মগ্ন থাকেন। অতীতের পাপ ও অন্যায়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের কল্যাণ কামনা করে মোনাজাত করেন।
এ উপলক্ষ্যে রাজশাহী মহানগরীর প্রতিটি মসজিদে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ, দোয়া মাহফিল, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হামদ-নাতসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন আলোচনা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। শবেবরাত উপলক্ষ্যে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরকারি ছুটি। সংবাদপত্র মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বন্ধ থাকবে। এ রাতের তাৎপর্য তুলে ধরে রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে।
পবিত্র শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অনেকের বাড়িতে হালুয়া-রুটিসহ উপাদেয় খাবার তৈরি করা হয় এবং তা আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিব-দুঃখীর মধ্যে বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যার পর অনেকে কবরস্থানে যান এবং আপনজনদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেন।
পবিত্র শবে বরাত মুসলমানদের কাছে পবিত্র রমজানের আগমনী বার্তাও নিয়ে আসে। শাবান মাসের পরে আসে পবিত্র রমজান মাস। তাই শবে বরাত থেকেই কার্যত রমজানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।
হাদিসে শবে বরাতের ফজিলত
এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলার রহমত বিশেষভাবে তার সৃষ্টির ওপর বর্ষিত হয়।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন- ‘আল্লাহ তাআলা মধ্য-শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের ভেড়াগুলোর পশমের চেয়েও বেশি সংখ্যক মানুষকে ক্ষমা করেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৯)
অন্য এক হাদিসে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন- আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে আছে, নবীজি (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তার সৃষ্টির দিকে দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)
এই হাদিসগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ক্ষমা পেতে হলে হৃদয়কেও রাখতে হবে পরিচ্ছন্ন।
শবে বরাতে বর্জনীয় সংস্কৃতি
দুঃখজনকভাবে, এই পবিত্র রাতকে ঘিরে সমাজে কিছু অনুচিত প্রথা চালু রয়েছে, যা ইসলামের মূল চেতনার পরিপন্থী। ইবাদতের এই রাতকে কোনোভাবেই আনন্দ-উৎসবে রূপ দেওয়া ঠিক নয়। শবে বরাতে আতশবাজি বা পটকা ফোটানো সম্পূর্ণ ইসলাম বহির্ভূত ও অপচয়মূলক। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ইবাদতকারীদের একাগ্রতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। মসজিদ বা ঘরবাড়িতে অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা অনেক আলেমের দৃষ্টিতে অতিরঞ্জন ও অপব্যয়ের শামিল।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আমাদের জীবনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি আত্মিক প্রশান্তির সুযোগ তৈরি হয়। এই রাতে যে আমলগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়—
১. নফল নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াত
২. দীর্ঘ সেজদা ও আল্লাহর জিকিরে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা
৩. দান-সদকা করা
৪. কবর জিয়ারত করার মাধ্যমে এই রজনীতে মৃত স্বজনদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ করা
আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার
পবিত্র এই রজনীর প্রধান উদ্দেশ্য হলো তওবা ও আত্মশুদ্ধি। হাদিসে যেহেতু বিদ্বেষ পোষণকারীদের ক্ষমা না করার কথা এসেছে, তাই আমাদের উচিত অন্যের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার পরিত্যাগ করা। বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে শান্তি ও সহমর্মিতার বড় অভাব। শবে বরাত আমাদের শিক্ষা দেয়—সংকীর্ণতা নয়, উদারতাই হোক আমাদের পথচলা।
পবিত্র এই রজনী আমাদের হৃদয়ের সব কালিমা ধুয়ে মুছে দিক। বিভেদহীন, মানবিক ও শান্তিময় এক পৃথিবীর জন্য হোক আমাদের প্রার্থনা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের ইবাদত কবুল করুন। আমিন।