৪৬% ওষুধের শেষ গাজায়: ‘গণহত্যা থামেনি’, সতর্কবার্তা মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টাইন্সের
“গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা হয়তো এক বছর আগের চেহারার মতো নেই, কিন্তু তা শেষ হয়নি”—এই সতর্কবার্তা দিয়েছে ব্রিটিশভিত্তিক স্বাস্থ্যসংস্থা গবফরপধষ অরফ ভড়ৎ চধষবংঃরহরধহং (ম্যাপ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় ৪৬ শতাংশ ওষুধের মজুত ফুরিয়ে গেছে। জরুরি চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবেশে চলমান বাধা হাজার হাজার মানুষের আরোগ্যপ্রক্রিয়াকে বিপন্ন করছে।
গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংসের ফলে দশ হাজারেরও বেশি মানুষ পুনর্গঠনমূলক (রেকনস্ট্রাকটিভ) চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে আজীবন শারীরিক অক্ষমতার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য ও ল্যাবরেটরি পরিকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) পর্যবেক্ষণের অধিকাংশ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছে—যা শুধু প্যালেস্টিনিয়ানদের নয়, আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি।
খাদ্য ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রীর সরবরাহে তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন সরবরাহের অনিশ্চয়তা—বিশেষ করে শিশুদের দুধের ক্ষেত্রে—গুরুতর জটিলতা তৈরি করছে। সংগঠন উড়পঃড়ৎং অমধরহংঃ এবহড়পরফব জানিয়েছে, নিয়মিত ব্র্যান্ডের ফর্মুলা না পেয়ে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে যা পাওয়া যায় তাই ব্যবহার করছে। এর ফলে শিশুদের ডায়রিয়া, জলশূন্যতা ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে।
সংগঠনটির বক্তব্য, ফর্মুলা ঘাটতি বা ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে অভিভাবকেরা কখনও অতিরিক্ত জল মিশিয়ে, কখনও বিকল্প ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে ওজন না বাড়া, সংক্রমণ এবং মস্তিষ্ক ও দেহের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুষ্টিহীনতা দেখা দিচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত গাজা মৃত্যুহার সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরিকাঠামো ধ্বংস ও পরোক্ষ কারণে ১৬,৩০০–র বেশি মানুষের মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। একই সমীক্ষায় সরাসরি হামলায় অন্তত ৭৫,২০০ জন নিহত হয়েছেন বলে অনুমান করা হয়েছে—যা গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের আগের নিশ্চিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ঞযব খধহপবঃ–এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে গবেষকরা লিখেছেন, ৫ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত গাজা উপত্যকার জনসংখ্যার ৩.৪ শতাংশ হিংসাত্মকভাবে নিহত হয়েছে বলে সম্মিলিত প্রমাণ ইঙ্গিত করে।
এদিকে, ইসরায়েলি হেফাজতে আটক প্যালেস্তিনীয়দের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। প্যালেস্তিনীয় বন্দি বিষয়ক সংগঠন চধষবংঃরহরধহ চৎরংড়হবৎং’ ঝড়পরবঃু (পিপিএস) জানিয়েছে, শত শত নামহিলা রী ও কিশোরী এখনও কারাবন্দি। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফিদা আসসাফ, যিনি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শুরু থেকে বন্দি। পিপিএস-এর অভিযোগ, তিনি অপুষ্টি, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা এবং অবমাননাকর পরিবেশের শিকার।
স্বাস্থ্যকর্মীরাও বন্দিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ। কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে ২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক প্যারামেডিক হাতেম ইসমাইল আবদুললতিফ রাইয়ানের কারাগারে মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন সংহতি গোষ্ঠী সকল আটক চিকিৎসাকর্মীর মুক্তির দাবি তুলেছে। তাঁদের পরিবার জানিয়েছে, কারাগারে নিয়মিত নির্যাতন ও চিকিৎসা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন তারা।
সার্জন মুরাদ আল-কৌকার স্ত্রী ইসরা আল-কৌকা ‘হেলথকেয়ার ওয়ার্কার্স ওয়াচ’–কে বলেন, “আমার স্বামীকে নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে; গুরুতর মাথা ও চোখের আঘাত, হার্নিয়েটেড ডিস্ক এবং উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “একজন প্যারামেডিক যদি কারাগারে মারা যান, তবে চিকিৎসাসেবা ও সুরক্ষা ছাড়া থাকা আমার স্বামীর জন্য আমি কীভাবে ভয় না পাই?”
গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয়, ওষুধের ঘাটতি, শিশু পুষ্টি সংকট এবং বন্দি চিকিৎসাকর্মীদের অবস্থা—সব মিলিয়ে মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
তথ্যসূত্র: আজকাল অনলাইন