রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ইয়েমেনের হুথিদের রহস্যময় নীরবতা

সোনার দেশ ডেস্ক ০৭ মার্চ ২০২৬ ০১:১০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৭ মার্চ ২০২৬ ০১:১০ অপরাহ্ন
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে ইয়েমেনের হুথিদের রহস্যময় নীরবতা
ইয়েমেনের হুথি যোদ্ধাদের ফাইল ছবি

ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিধ্বংসী যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তেহরান থেকে শুরু হওয়া আগুনের লেলিহান শিখা আবুধাবি, দোহা, কুয়েত সিটি, মানামা ও বৈরুতকে গ্রাস করলেও একটি দেশ এখন পর্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত, সেটি হলো ইয়েমেন। লোহিত সাগরে ত্রাস সৃষ্টি করা ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কেবল মৌখিক নিন্দা ও বিক্ষোভের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা কেন এখনও ‘ট্রিগারে আঙুল’ রেখেও গুলি ছুড়ছে না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের এই নীরবতা মূলত তাদের কৌশলগত ধৈর্য এবং গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতার ফসল। গত আগস্টে সানায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হুথি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাওয়ি ও চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ আল-ঘুমারিসহ ১২ জন উচ্চপদস্থ নেতা নিহত হন। এই বিশাল ক্ষতি হুতি নেতৃত্বকে অনেক বেশি সতর্ক করে তুলেছে।

এসিএলইডি-এর সিনিয়র বিশ্লেষক লুকা নেভোলা বলেন, হুথিরা সম্ভবত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার ভয় পাচ্ছে। তাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা এড়ানো।

তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহারের অপেক্ষায় তেহরান?

ইয়েমেনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদাম আল-হুরাইবি মনে করেন, হুথিরা যুদ্ধে নামবে কি না তা নির্ভর করছে ইরানের সবুজ সংকেতের ওপর। তিনি বলেন, তেহরান তার সব কার্ড একসাথে ব্যবহার করতে চায় না। তারা হুথিদের যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য জমিয়ে রাখছে। ইসরায়েলি-মার্কিন হামলা না থামলে হুথিরা অনির্দিষ্টকাল হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।

হুথি প্রধান আবদেল মালিক আল-হুতি সম্প্রতি এক ভাষণে বলেছেন, ইয়েমেন ইরানের পাশে আছে এবং আমাদের হাত ট্রিগারে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, হুথিরা যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়ায়, তবে তারা কেবল ইসরায়েল নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।

ইরানের পতনের আশঙ্কা ও হুথিদের ভবিষ্যৎ

ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর একের পর এক হামলা হুথিদের মনোবলে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশ্লেষক আল-হুরাইবি বলেন, ইরান হুথিদের জন্য একটি ধর্মীয় আদর্শ। সেই আদর্শ যদি পরাজিত হয়, তবে তাদের মনোবল অটুট থাকা কঠিন। এছাড়া ইরান থেকে আসা অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেলে হুথিরা সামরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে।

ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতে, রাশিয়া, চীন ও ইরানে তৈরি অস্ত্র বিভিন্ন পথে ইয়েমেনে পাচার করা হয়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।

যুদ্ধ ইয়েমেনের মাটিতে না পৌঁছালেও সানার সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ২৮ বছর বয়সী সানা নিবাসী মোহাম্মদ ইয়াহিয়া জানান, যুদ্ধের খবর পাওয়ার পরপরই তিনি পরিবারকে আটা, চাল ও রান্নার গ্যাস মজুত করতে বলেছেন। তিনি বলেন, আমি ভেবেছিলাম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সানায় বোমা বর্ষণ শুরু হবে। পুরো অঞ্চল যুদ্ধে লিপ্ত, আর আমরা ইয়েমেনিরা কেবল দর্শক হয়ে তাকিয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত হুথিরাই সিদ্ধান্ত নেবে ইয়েমেন এই আগুনে পুড়বে কি না।

লোহিত সাগরে ইতোমধ্যে ৪টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং ৯ জন নাবিককে হত্যার রেকর্ড থাকা হুথিরা যদি নতুন করে হামলা শুরু করে, তবে তা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসছে, তখন হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন