বুধবার, এপ্রিল ১৫, ২০২৬

মোহনপুরে বিদেশে চাকরির ফাঁদ, প্রতারণায় নিঃস্ব বহু পরিবার

শাহীন সাগর, মোহনপুর ১২ মার্চ ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন সাগর, মোহনপুর ১২ মার্চ ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন
মোহনপুরে বিদেশে চাকরির ফাঁদ, প্রতারণায় নিঃস্ব বহু পরিবার

বিদেশে ভালো চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে প্রলোভন দেখানো এবং ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায়। 


নিউজিল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় থানায় একাধিক অভিযোগ দায়েরের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তারা।


গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহীর একটি প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা জানান, বিদেশে পাঠানোর নামে প্রায় অর্ধকোটি টাকার বেশি প্রতারণা করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে প্রণব কুমার সাহা বলেন, প্রায় এক বছর আগে তার পরিচয় হয় ভুট্টো মৃধার সঙ্গে। ভুট্টো মৃধা নিজেকে মোহনপুর উপজেলার জাহানাবাদ ইউনিয়নের চক বিরহী গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমানের হয়ে কাজ করেন।


মশিউর রহমানের বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়। পরে ১৪ লাখ টাকার চুক্তিতে নিউজিল্যান্ডে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে ভুক্তভোগীরা ১০ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করেন। চারজনের নামে আলাদা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিপত্রও তৈরি করা হয়। কিন্তু বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে আটকে গেলে জানা যায়, দেওয়া কাগজপত্র সম্পূর্ণ জাল। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন।


সংবাদ সম্মেলনের পর অনুসন্ধানে জানা যায়, মোহনপুর উপজেলার চক বিরহী এলাকায় আরও অনেক মানুষ একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।


মির্জাপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ জানান, প্রায় ছয় মাস আগে তাকে এশিয়ার লাওস দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখান মশিউর রহমানের বড় ভাই মতিউর রহমান। তিনি কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক এবং স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তার কথায় বিশ্বাস করে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে কালামসহ কয়েকজন লাওসে যেতে সম্মত হন। তাদের মধ্যে মোট ১২ জনকে ওই দেশে পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে তারা কোনো কাজ পাননি। পরে নানা দুর্ভোগ পেরিয়ে তারা দেশে ফিরে আসেন।


এদিকে কম্বোডিয়ায় কাজের প্রলোভনে চার যুবকের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা প্রতারণার অভিযোগে মোহনপুর থানায় পৃথক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।


অভিযোগকারী সামিম পাঠান জানান, পলাশ হোসেন নামে এক ব্যক্তি তাকে কম্বোডিয়ায় কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন। পরে সামিম পাঠানসহ চারজন মিলে তাকে ২৪ লাখ টাকা দেন। দুই মাস পর তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হলেও সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, চাকরির ভিসা নয় বরং টুরিস্ট ভিসায় পাঠানো হয়েছে।


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালালরা তাদের অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করে দেয়। পরে প্রায় ৮৭ দিন আটকে রেখে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আরও ৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরিবারের সহায়তায় সেই টাকা পরিশোধ করার পর তারা দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হন।


দেশে ফিরে অভিযুক্তদের কাছে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ ঘটনায় পলাশ হোসেন, তার বাবা আনছার আলী ও মা মার্জিয়া বিবিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।


স্থানীয়দের দাবি, মোহনপুর ছাড়াও বাগমারা উপজেলার বাইগাছা ও সাঁইপাড়া এলাকার বহু মানুষের কাছ থেকেও বিদেশে পাঠানোর নামে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। এতে এলাকার অনেক পরিবার আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।


অভিযুক্ত ভুট্টো মৃধা অভিযোগের বিষয়টি আংশিক স্বীকার করে বলেন, ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং এজন্য সময় প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, প্রথমে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমানের মাধ্যমে এবং পরে জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার এক ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করেছেন।


অন্যদিকে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মশিউর রহমান বর্তমানে আন্টার্কটিক মহাসাগরে একটি জাহাজে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি প্রতিবেদককে ব্লক করে দেন।


অভিযোগের বিষয়ে কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের ক্রীড়া শিক্ষক মতিউর রহমান বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর কাজে তিনি সরাসরি জড়িত নন। তবে একটি গ্রুপ পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তার দাবি, ভুট্টো মৃধা তার নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করেছে। যাদের সমস্যা হয়েছে তাদের তিনি নিজ খরচে দেশে ফিরিয়ে এনেছেন বলেও জানান।


মোহনপুর থানার এসআই ইয়ামিন আলী বলেন, বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণার বিষয়ে দুটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা বিনতে আখতার বলেন, “এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ গ্রহণ, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।