রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি সংকটে অনিশ্চয়তায় কৃষকের কোটি টাকার স্ট্রেবেরি ফসল

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি সংকটে অনিশ্চয়তায় কৃষকের কোটি টাকার স্ট্রেবেরি ফসল

চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি সংকটের মুখে স্ট্রবেরি চাষ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। উৎপাদনে সাফল্য এলেও পরিবহন সংকটে বাজারে পৌঁছাতে পারছে না পচনশীল এই ফল। ফলে মাঠেই পড়ে নষ্ট হচ্ছে স্ট্রবেরি, আর চোখের সামনে লোকসানের হিসাব বাড়তে দেখছেন কৃষকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ক্ষতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।


সরেজমিনে শিবগঞ্জ উপজেলার কালোপুর গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে স্ট্রবেরির বাম্পার ফলন হয়েছে। উন্নত জাতের চারা ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের প্রত্যাশা ছিল উচ্চ লাভের। কিন্তু ডিজেল সংকটে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সেই আশায় ভাটা পড়েছে।


স্ট্রবেরি চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, এই ফল ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখন গাড়ি নেই, পরিবহন নেই, ফলে সময়মতো বাজারে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।


স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, পিকআপ ভ্যান ও মিনি ট্রাকসহ ছোট পরিবহনগুলো ডিজেলের অভাবে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক চালক জ্বালানি না পেয়ে গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিয়েছেন। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ বড় পাইকারি বাজারে স্ট্রবেরি পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।


এই সংকটের সুযোগে স্থানীয় পাইকাররা কম দামে স্ট্রবেরি কিনে নিচ্ছেন। এতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করছেন।


স্ট্রবেরি চাষি আজিম উদ্দিন বলেন, এক বিঘা জমিতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছে। কিন্তু এখন খরচই উঠছে না। আরেক চাষি নাদিম আলী জানান, আগে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। এখন ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হচ্ছে।


বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শুধু জ্বালানি সংকট নয়, সমন্বয়হীন বাজার ব্যবস্থাপনাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ বা বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা ফসল ধরে রাখতে পারছেন না। ফলে অতিরিক্ত সরবরাহে স্থানীয় বাজারে দাম আরও কমে যাচ্ছে।


জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্ট্রবেরির গণ্ডি ছাড়িয়ে আম চাষেও পড়তে শুরু করেছে। কীটনাশক ছিটানোর জন্য ব্যবহৃত স্প্রে মেশিনগুলো ডিজেলনির্ভর হওয়ায় সময়মতো পরিচর্যা ব্যাহত হচ্ছে। এতে পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে সব ধরনের কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। তবে পচনশীল হওয়ায় স্ট্রবেরি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।


তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।


কৃষকরা দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃষিপণ্য পরিবহনে বিশেষ সুবিধা এবং অস্থায়ী সংরক্ষণ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে কৃষকের লোকসান যেমন বাড়বে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাঠে এখন ফলনের হাসি নেই, আছে অনিশ্চয়তা আর হতাশা। জ্বালানি সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তবে এই ক্ষতি শুধু কৃষকের নয়, পুরো কৃষি ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।