পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা নিয়ে কোনো অজুহাত সহ্য করা হবে না: শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা নিয়ে কোনো অজুহাত সহ্য করা হবে না। পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল এমন অজুহাতও শুনবো না। যদি এমন হয় তাহলে বুঝব ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে রাজশাহীতে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬ উপলক্ষে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের ইঙ্গিত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আইন এমনভাবে স্টিপোলড (নির্ধারিত) করব যা কেবল ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন কীভাবে ফাঁস হচ্ছে, তা আমাদের নখদর্পণে। এখন থেকে সব নজরদারি করা হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ভাবছে আগের মতো মব করলে কিংবা ফেসবুকে হাহা রিয়্যাক্ট দিলে বোধহয় আমি ঘাবড়ে যাবো। মোটেও না। গুজব রটানো হয়েছে পরীক্ষার হলে ঘাড় ঘোরাতে দেওয়া হবে না। কেন ঘাড় ঘোরানো যাবে না? শিক্ষার্থীদের ঘাড় ঘোরাতে দেবো না এটা কি হয়, আপনারা ঘোরাননি? সবাই ঘুরিয়েছেন। এটা ধরতে কিন্তু সিসিক্যামেরা লাগাবো না।
এহছানুল হক মিলন বলেন, আমি তো কাউকে থ্রেট করিনি, শিক্ষার্থীদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। এখন তো সেই দিনও নেই যে হেলিকপ্টার নিয়ে ঘুরবো। কিন্তু তারা আমার পদত্যাগ চাইছে। আমি কেন পদত্যাগ করবো? পদত্যাগ তো তখন করবো, যখন সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষাটা আমি নিতে পারবো না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শূন্য শতাংশ পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও বন্ধের পূর্বঘোষণা থাকলেও মানবিক বিবেচনায় এবার তা কার্যকর করা হচ্ছে না। তবে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘পোষ্য কোটা’র কড়া সমালোচনা করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে পাশ করেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে হবে। আমরা চাই না কেউ বিনা পরীক্ষায় বা বিশেষ সুবিধায় পার পেয়ে যাক। এছাড়া তিনি প্রস্তাব করেন, জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সন্তানদের বাধ্যতামূলকভাবে জেলা স্কুলেই পড়ানো উচিত, যাতে সরকারি স্কুলগুলোর মানোন্নয়নে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মানবসম্পদ তখনই অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে যখন তাকে কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের (রিফর্ম) ডাক দেন।
সঙ্ঘবদ্ধ কোনো নকল চক্র থাকলে তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা চাই না পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি ছড়াক বা ফলাফলে ধস নামুক। তবে কোনোভাবেই বিনা পরীক্ষায় পাশ বা অনৈতিক সুযোগ দেওয়া হবে না।
মতবিনিময় সভায় রাজশাহী অঞ্চলের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং তিন বোর্ডের বিভিন্ন কেন্দ্রের সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম।
এদিন সকালে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শহীদ ওসমান বিন হাদী অডিটোরিয়ামে আঞ্চলিক স্কিলস অ্যান্ড ইনোভেশন কম্পিটিশন উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষাখাতে আগামীতে বাজেট আরও বাড়বে, তবে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি কারিগরি শিক্ষাকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে এ খাতকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সেমিনারে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ার কারণ, তাদের অগ্রগতি এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার উপায় সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে শিক্ষার্থীরা অনিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা গ্রহণে বিলম্ব এবং কারিকুলামের সঙ্গে সিলেবাসের অসামঞ্জস্যতাসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামীতে শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি পাবে। তবে এই বাজেট যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হলে শিক্ষার কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যয় করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই এ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই কারিগরি শিক্ষাকে অবহেলা করা যাবে না, বরং এ শিক্ষার মাধ্যমেই আমাদের উন্নয়নের নতুন বিপ্লব ঘটাতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, জাতি গঠনের লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আরও বলেন, ‘মন্ত্রী আসেন ও যান, কিন্তু আমাদের সকলেরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট জবাবদিহি করতে হয়।’ তাঁর ভাষায়, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে মন্ত্রণালয়, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এনডিসি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী, বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ এবং রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ আবু হানিফ প্রমুখ।