ভারতের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন কি চ্যালেঞ্জের মুখে
ভারতের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নয়ডায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া শ্রমিক বিক্ষোভ কেবল বেতন বৃদ্ধির দাবি নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক আর্থসামাজিক সংকট। গত কয়েক দিনের সহিংসতা এবং গণ-গ্রেপ্তারের পর পরিস্থিতি বর্তমানে কিছুটা থিতিয়ে এলেও, এর অন্তর্নিহিত কারণগুলো নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট’। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভারতের বাজারেও বড় আঘাত হেনেছে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক শ্রমিকদের নাভিশ্বাস উঠছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, যেখানে ভারতের জিডিপি বাড়ছে, সেখানে নয়ডার শিল্পাঞ্চলে তাঁদের বেতন ১০ থেকে ১৫ হাজার রুপির মধ্যে আটকে আছে বছরের পর বছর। এই মজুরি স্থবিরতাকে তাঁরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক নির্মম দলিল হিসেবে দেখছেন।
আন্দোলনের আগুন আরও উসকে দিয়েছে প্রতিবেশী রাজ্য হরিয়ানার সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্ত। সেখানে ন্যূনতম মজুরি ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি করায় নয়ডার শ্রমিকদের মধ্যে বঞ্চনার বোধ আরও প্রকট হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে মজুরি বৃদ্ধির আশ্বাস দেওয়া হলেও শ্রমিকেরা এটিকে ‘চোখে ধুলা দেওয়া’ বা ‘সাময়িক প্রলেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আন্তঃরাজ্য এই মজুরি বৈষম্য শিল্পাঞ্চলগুলোতে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এবারের আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রথাগত ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। কোনো বড় রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়াই হাজার হাজার শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এসেছেন। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবে আন্দোলন দ্রুত সহিংস রূপ নিয়েছে, যার ফলে নয়ডায় গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে।
নয়ডার কারখানাগুলোর বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের। কাঁচামালের দাম বাড়লে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে তাদের পক্ষে শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এই ‘থিন মার্জিন’ বা অল্প মুনাফা রক্ষা করতে গিয়ে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কাজের সময় বাড়িয়ে দেয় (ওভারটাইম, শোষণ), যা শেষ পর্যন্ত চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়।
বিক্ষোভের এই ঢেউ এখন আর কেবল কারখানার ফটকে সীমাবদ্ধ নেই। নয়ডার গৃহকর্মী এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরাও এখন বেতন বৃদ্ধি ও উন্নত বাসস্থানের দাবিতে সরব হতে শুরু করেছেন। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে হরমুজ প্রণালিতে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সার ও জ্বালানির ঘাটতি দেখা দেবে, যা ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভয়াবহ খাদ্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। নয়ডার এই অসন্তোষ সেই বৃহত্তর মহাবিপর্যয়ের একটি প্রাথমিক সংকেত মাত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নিরসনে কেবল মজুরি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। তাঁরা কয়েকটি সুপারিশ করেছেন: শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ওভারটাইম শোষণের ওপর নজরদারি বাড়ানো; ক্ষুদ্র শিল্প মালিকদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ভর্তুকি প্রদান; রাজ্যভেদে আকাশপাতাল বৈষম্য কমাতে একটি সুসংহত ‘জাতীয় মজুরি কাঠামো’ কার্যকর করা।
নয়ডার এই বিক্ষোভ ভারতের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হয়ে ওঠার স্বপ্নকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখনই সঠিক ব্যবস্থা না নিলে এই অসন্তোষের আগুন ভবিষ্যতে আরও দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, আজকের পত্রিকা অনলাইন