বিএনপি নেতাকে থাপ্পর, পাল্টা শিক্ষিকাকে জুতাপেটা
রাজশাহীতে স্থানীয় বিএনপি নেতাকে থাপ্পর দেওয়ায় কলেজ শিক্ষিকাকে জুতাপেটা করা হয়েছে। এছাড়াও কলেজের অধ্যক্ষের উপরে হামলা চালানো হয়েছে। কলেজ শিক্ষিকা জুতাপেটা করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে নিন্দার ঝড় উঠেছে।
ঘটনাটি দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। এই কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয়বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে পরীক্ষা চলাকালীন এ ঘটনা ঘটে। এসময় কলেজে ভাঙচুর ও অন্য শিক্ষককেও মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় অন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ ও নারী শিক্ষকসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। পরীক্ষাকেন্দ্র হওয়ায় কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল এবং সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, দুপুরের দিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের কক্ষে গিয়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাকবিতণ্ডায় জড়ান। বিশেষ করে আগের অধ্যক্ষের সময়ে কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাব চান তারা। এ নিয়ে তাদের মধ্য কথা কাটাকাটি হয়।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিএনপি নেতারা কলেজের অধ্যক্ষেও অফিসে বসেছিলেন। আলেয়া খাতুন সেখানে ভিডিও করছিলেন। স্থানীয় বিএনপি আকবর আলী আলেয়া খাতুনকে নিয়ে কটূক্তি করেন। এরপর তিনি নিজের পা থেকে স্যান্ডেল খুলে মারতে শুরু করেন।
এছাড়াও ভাইরাল হওয়া আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, কলেজের মাঠের মধ্যে আরেকজনের সঙ্গে মারামারি করছেন। যিনি ভিডিও করছিলেন তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এই দেখেন- এটা কলেজ না পতিতালয়। এটা পতিতালয়ের মহিলা। দাওকান্দি কলেজের ম্যাডাম পতিতা, নষ্ট পল্লীর মহিলা।’
তবে এই ভিডিও কে করেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই ভিডিওটি কলেজের অধ্যক্ষের রুমে হামলা চালানোর আগের ঘটনা।
এই ঘটনার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা গিয়ে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা চালান। এসময় অফিস কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুরও করা হয়। হামলায় আহতদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক, প্রভাষক আলেয়া খাতুন, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ আরও দুই কর্মচারি। তাদের কয়েকজনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রভাষক আলেয়া খাতুন বলেন, বিভিন্ন সময় কলেজে এসে আমাদের বিরক্ত করতেন। কারণে-অকারণে তারা হিসাব চাইতেন। তারা ইসলামী জলসা করবেন বলে কলেজ থেকে টাকা চাইতে এসেছিলেন। একই সঙ্গে তারা কলেজের মাঠ ব্যবহার করবেন। এবং কলেজের সব শিক্ষককে টাকা দিতে হবে। আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, তারা চাঁদা চাইতে এসেছিল সে ভিডিও আমি করছিলাম। আকবর আলী আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলেন- তাই ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে থাপ্পড় মেরেছিলেন। এরপর সে তার মায়ের স্যান্ডেল খুলে আমাকে পেটাতে থাকেন। আমাকে বিবস্ত্রও করতে চেয়েছিল। আমি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। এদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।
স্থানীয় বিএনপি নেতা আকবর আলী দাবি করেন, কলেজের আগের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির হিসাব চাইতে গেলে উল্টো তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। শিক্ষক আলেয়া খাতুন প্রথমে আমাদের ওপর হামলা করেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের অভিযোগ, চার মাস আগে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। কোন সময় একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬ শে মার্চের দিবসের জন্য টাকা চাইতে আসতো। পহেলা বৈশাখ পালন করার জন্যও তারা টাকা চেয়েছিল। কিন্তু এগুলো দিতে রাজি হয়নি। সবশেষ তারা জলসার নামে টাকা দাবি করে।
তিনি বলেন, তাদের টাকা চাওয়ার ভিডিও করা হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে নারী শিক্ষকের উপরে হামলা করেন। এরপর আমার রুমও ভাঙচুর ও আমাকে মারধর করা হয়। এতে বেশ ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে তারা আমাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। কলেজে গেলে প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দিচ্ছে।
দুর্গাপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিল এবং উভয়পক্ষকে নিবৃত করার চেষ্টা করা হয়। তবে কিছু লোক জোরপূর্বক প্রবেশ করে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করছি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, কলেজে পুলিশ পাঠানো হয়েছে তদন্ত করার জন্য। ফোর্সসহ তারা গেছে। কি পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তা বোঝা যাবে। অভিযুক্তদের আটকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা এখন পর্যন্ত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে।