রাজশাহী অঞ্চলে আমের ভালো ফলনের আশা
রাজশাহীতে গাছে গাছে উঁকি দিচ্ছে আম। আরও মাসখানেক পরে বাজারে মিলবে পাকা আম। গেলবারের লোকসান পুষিয়ে নিতে চান চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এ বছর ভালো ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ ও চাষিরা। বাগান মালিকরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছের পরিচর্যা থেকে পোকা দমনে।
রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠন করা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চল। এই চার জেলায় ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আমবাগান আছে। এসব বাগানে গাছ আছে ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৪টি। চলতি মৌসুমে রাজশাহী অঞ্চলে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন। এর বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ১৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আবহাওয়া অনূকুলে থাকলে এবারও ভালো ফলন হবে আশা করছেন চাষিরা।
গেল মৌসুমে ফলন ভালো হলেও বৃষ্টির কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসান গুনেছেন। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিয়েছেন চাষিরা। কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউ আবার পোকামাকড় ও রোগবালাই দমনে স্প্রে করছেন। কৃষকরা বলছেন, ভালো মানের ফলন পেতে তিন মাসে অন্তত ৬ থেকে ৭ বার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়।
আমচাষিরা জানান, চলতি মৌসুমে বাগানে প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। সেই মুকুল প্রাকৃতিক নিয়মে অনেক ঝরে গেছে। যেগুলো ছিল তা থেকে আম এসেছে। তবে সেগুলো এখন প্রচণ্ড খরায় ও পোকার উপদ্রবে ঝরে যাচ্ছে। আমগাছে পানি ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও অনেকে গুটি রক্ষা করতে পারছেন না। প্রতি বছরই আমের কিছু গুটি ঝরে যায়।
আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহীতে বুধবার (২২ এপ্রিল) তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়াও মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোরে গড়ে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি থাকছে গেল দুই সপ্তাহ ধরে।
রাজশাহী জেলার বেশির ভাগ আমবাগান চারঘাট ও বাঘা উপজেলায়। বাঘা উপজেলার সাদি এন্টারপ্রাইজ কয়েক বছর ধরে বিদেশে আম রপ্তানি করছে। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আসাফুদ্দৌলা বলেন, এবার আমের মুকুল বেশ ভালো এসেছে। পরিচর্যাও করা হয়েছে। যেটুকু মুকুল ঝরে যাওয়া তা ঝরে গেছে। গাছে থোকা থোকায় আম আছে। তাপমাত্রা এমন অব্যাহত থাকলে আম নষ্ট হয়ে যাবে। আর গাছে পোকার উপদ্রব দেখা যাচ্ছে। এখন বাগানে মাছি পোকা, লেদা পোকানাশক বিষ দেয়া হচ্ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার আমচাষী তৌহিদুর রহমান পারভেজ বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে আম শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনোটায় কালো রঙ ধারণ করছে। এছাড়া পোকা ছিদ্র করায় ও বোটার রস খাওয়ায় আম শুকিয়ে ঝরে পড়ছে। এতে আমের ফলন নিয়ে শঙ্কায় আছি। অনুমোদিত মাত্রার বাইরে ওষুধ ব্যবহার করিনি। অনুমোদিত মাত্রায় ওষুধ দিয়ে পোকার আক্রমণ থেকে আম বাঁচানো যাবে না। তাপমাত্রা কমে গেলে আশা করা যাচ্ছে গেল বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিহারীপাড়া গ্রামের আসিফ ইকবালের ৩০ বিঘার বাগানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের আমগাছ রয়েছে। বড়, মাঝারি ও ছোট সব রকমই গাছ আছে বাগানটিতে। ৭২ জাতের আম রয়েছে বাগানে। তিনি বলেন, হপার পোকা ও আচা পোকা বাগানে আমের ক্ষতি করছে। এছাড়া আম ছিদ্রকারী পোকা উড়ে এসে হুঁল ফুটিয়ে চলে যাচ্ছে। সেজন্য কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে। অতিরিক্ত খরার কারণে গাছে থাকা অবস্থাতেও আমের বোটা শুকিয়ে কুচকে যাচ্ছে। যারা পরিমিত সেচ ও সঠিক মাত্রায় কীটনাশক স্প্রে করতে পারছেন তাদের গাছে আম এখনো বেশ বিদ্যমান আছে। কিন্তু যারা করতে পারছে না তাদের আম দ্রুতই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহী পবা উপজেলার কয়রা গ্রামের কৃষক সিরাজুল হক বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এ বছর ফলন ভালো হবে। প্রায় সব গাছেই আম এসেছে, যা সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় আশাব্যঞ্জক।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জার্মানি, ইংল্যান্ড, সুইডেন, ইতালি, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কানাডায় প্রায় ৪০ কোটি ৮৯ লাখ টাকার আম রপ্তানি হয়েছে। প্রতি কেজি আমের গড় মূল্য ছিল ৯৩ টাকা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে এই চার জেলায় মোট আম উৎপাদন হয়েছিল ১০ লাখ ২৮ হাজার ৮৪৫ মেট্রিক টন। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টনে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ মেট্রিক টন। এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, প্রতি কেজি গড়ে ৯৩ টাকা দরে মোট সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১১ হাজার ১৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, তাপদাহের কারণে কিছু আম নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। এরপরও এবার ভালো আম উৎপাদন হবে বলে আশা করি। চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এবার দামও ভালো পাওয়া যাবে।
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের পরিচর্যার কারণে এ বছর আমের ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজশাহীর আম মৌসুমকে ঘিরে বিরাজ করছে আশাবাদের সুবাতাস।