রবিবার, মে ০৩, ২০২৬

রাণীনগরে শতাধিক বিঘার অর্পিত জমি অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সরকারের মামলা

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ ০৩ মে ২০২৬ ০৩:০৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ ০৩ মে ২০২৬ ০৩:০৬ অপরাহ্ন
রাণীনগরে শতাধিক বিঘার অর্পিত জমি অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সরকারের মামলা

নওগাঁর রাণীনগরে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে কোটি টাকা মূল্যের সরকারি অর্পিত সম্পত্তি নিজেদের দখলের নেওয়ার পায়তারার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষে মামলা দায়ের করা হয়েছে। উপজেলার কাশিমপুর ইউনিয়নের কুজাইল গ্রামের মৃত-নমির উদ্দিন প্রামাণিকের ছেলে একেএম শামসুল হক ঝন্টু ও একেএম শহিদুল আলম টুকুসহ ২৯জনকে আসামী করে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোছা. সাহিদা সুলতানা। 

চলতি বছরের জানুয়ারী মাসের ১৯তারিখে করা মামলা থেকে জানা যায় যে, ভুয়া দলিলের মাধ্যমে শতাধিক বিঘা ভিপি ও খাস জমি একটি অসাধু চক্র নিজেদের নামে পেতে চায়। এর আগে ওই চক্রটি আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভুয়া পরিচয়ের ব্যক্তির নামে সরকারকে বিবাদী করে মামলা দায়ের করা হয়। চলমান সেই মামলার সবকিছু ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় পরবর্তিতে সরকার বাদী হয়ে ওই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। দ্রুত সরকারের পক্ষের মামলাটি নিষ্পত্তি করা যায় তাহলে সরকারি সম্পত্তিগুলো লিজ প্রদানের মাধ্যমে প্রতি বছর কোটি টাকা রাজস্ব আয় করবে সরকার। 

মামলা সূত্রে জানা সিআর মামলার আসামীগণের মধ্যে অন্যতম মফিজ উদ্দিন চৌধুরীর ঠিকানা ছিলো ভুয়া। জেলার ধামইরহাট উপজেলার ৮নং খেলনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, সিনিয়র সহকারি কমিশনার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (ভিপি শাখা) নওগাঁ থেকে প্রেরণ করা ব্যক্তি মো: মফিজ উদ্দিন চৌধুরী পিতা-মৃত হাসান বক্স চৌধুরী, গ্রাম: উদয়শ্রী, ডাকঘর: খেলনা, ওয়ার্ড নং ০৬ নামীয় কোন ব্যক্তি অত্র ইউনিয়নের উদয়শ্রী গ্রামে অতিতে ছিল না বা বর্তমানেও নেই। উপজেলার কাশিমপুর রাজবাড়ির জমিদার অন্নদা প্রসন্ন লাহিড়ী দেশ ভাগের সময় পার্শ্ববতি দেশ ভারতে চলে যান।

রাজার রেখে যাওয়া শত শত বিঘা জমি ভিপি ও খাস হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ  করে শতাধিক বিঘা জমির মালিক বের হন। ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর মাসের বিনিময় দলিলের মাধ্যমে মফিজ উদ্দিন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি তার নামে রেজিস্ট্রি দেখায় যেখানে দাতা অন্নদা প্রসন্ন লাহিড়ী উল্লেখ করা হয়েছে। দলিলের সিরিয়াল নং ১২৫২৬। অথচ বিনিময় দলিল ১৯৬৫ সালের পর আর হয় না। ফলে ভবিষ্যৎ সমস্যা হতে পারে জেনে মফিজ উদ্দিন চৌধুরী জমিগুলো বিক্রয় করে দেন। পরবর্তিতে কুজাইল গ্রামের মৃত-নমির উদ্দিন প্রামাণিকের ছেলে একেএম শহিদুল আলম টুকু, দুর্গাপুর গ্রামের মৃত-আব্দুল গফুরের ছেলে আমিরুল ইসলাম, জাহানারা বিবি ও রোকেয়া বিবি। গ্রহিতা আমিরুল ইসলামের নামে আবার জন্মের আগেই রেজিস্ট্রি দেখানো হয়েছে। আপিল মামলা চলাকালে সরকার পক্ষের সন্দেহ হওয়ায় বাদীপক্ষের দলিলের সঠিকতা যাচাইয়ে সকল কিছু ভুয়া প্রমাণিত হয়। পরবর্তিতে সরকারের পক্ষে ওই চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে যা চলমান। 

মামলার অন্যতম সাক্ষী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মৃত-আফছার আলীর ছেলে জাকির হোসেন জানান সরকারি অর্পিত জমি ভুয়া ব্যক্তির নামে ১৯৬৭ সালে বিনিময় দলিলের মাধ্যমে একটি চিহ্নিত ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট ও আ’লীগ সরকারে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত ইসরাফিল আলম ও জিপি ফিরোজের আত্মীয় স্বজন এবং ৯ নাম্বার আসামী মো. মাসুম খানের স্ত্রী, শালক, চাচা শ্বশুরসহ আরো অনেকের নামে এই দলিল লেখক মাসুম খান ভুয়া দলিলগুলো তৈরি করে ২০১২ সালে নিজের জমি দাবি করে তারা আদালতে মামলা করে। এই জমি সরকার লিজ দিয়ে প্রতি বছর কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এই সম্পত্তি লিজ নিয়ে চাষাবাদের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের অনেক অসহায় ও গরীব শতাধিক মানুষের সংসার চলে। এই জমি সরকারের বেহাত হলে সরকারসহ সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষতি হবে। সেই জন্য সিআর ২৮/২৬ (রানী) এই মামলাটি সাক্ষী প্রমাণ নিয়ে দ্রুত নিস্পত্তি করলে সরকারি জমি রক্ষা পাবে। তাই বিষয়টির প্রতি সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপ এবং ভূমি মন্ত্রির সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয়রা। 

মামলার বাদি মোছা. সাহিদা সুলতানা জানান সরকারের অর্পিত সম্পত্তি রক্ষার্থে সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক মামলা দায়ের করা হয়েছে। দ্রুতই তদন্ত সাপেক্ষে মামলাটি নিষ্পত্তি করা গেলে দীর্ঘদিন মিথ্যে জটিলতার বেড়াজালে থাকা সরকারি সম্পত্তিগুলো যেমন মুক্ত হবে তেমনি ভাবে স্থানীয় শতাধিক গরীব-অসহায় মানুষরা লিজের মাধ্যমে চাষাবাদে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। অপরিদকে সরকার সেই সম্পত্তি থেকে বছরে কোটি টাকা রাজস্ব হিসেবে আয় করতে পারবে। তাই সরকারের স্বার্থ রক্ষার্থে দ্রুত মামলা শেষ করার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই কর্তকর্তা। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানান উপজেলার চককুজাইল মৌজার ৩৭ একর ভিপি সম্পত্তি দলিলে পেয়েছেন মর্মে দাবী করে কিছু ব্যক্তি ২০১২ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে মামলা করে। দাবীকৃত জমির মধ্যে কুজাইল বাজার, খেলার মাঠ, মন্দির, পুকুরও রয়েছে। এত বেশি পরিমাণ জমি হস্তান্তর করা হয়েছে দেখে সন্দেহ হলে প্রথম দলিলের গ্রহীতার সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে উক্ত নামের কোন ব্যক্তির কোন অস্তিত্ব ছিল না।

ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে যাদের জন্ম দলিলের তারিখের পরে। এছাড়া দলিল যাচাই করে দেখা যায় সংশ্লিষ্ট অফিসে এই দলিলের কোন অস্তিত্ব নেই। ফলে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা ও জালিয়াতির শাস্তি নিশ্চিত করতে এই ভুয়া দলিল রেজিস্ট্রি দেখানো সকল ব্যক্তির নামে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দ্রুত সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার নিশ্চিত হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন উপজেলার এই প্রধান কর্মকর্তা।