মঙ্গলবার, মে ০৫, ২০২৬

এক বিঘা জমির বাস্তবতা-কৃষকের ধানে নয়, খড়েই টিকে থাকার লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৫ মে ২০২৬ ০২:৩৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৫ মে ২০২৬ ০২:৩৪ অপরাহ্ন
এক বিঘা জমির বাস্তবতা-কৃষকের ধানে নয়, খড়েই টিকে থাকার লড়াই

রাজশাহীর পবা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের এক বিঘা ধানের জমি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় সোনালি ফসলের সমারোহ, কৃষকের ঘরে বুঝি ফিরছে স্বস্তি। কিন্তু ধান কেটে ঘরে তোলার পর হিসাবের খাতায় ধরা পড়ছে ভিন্ন চিত্র। উৎপাদন ভালো হলেও লাভের অঙ্ক মিলছে না। বরং অনেক কৃষকের কাছে ধান নয়, খড়ই হয়ে উঠছে শেষ ভরসা। এই এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন পাকুড়িয়া গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে এখন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়।

জমি নিজের না হলে বর্গা বা ভাড়ার খরচ যোগ হয়ে তা ২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি দাঁড়ায়। জমি প্রস্তুত, বীজতলা, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন—প্রতিটি ধাপেই আগের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে। কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন,“আগে যে কাজ ৪০০-৫০০ টাকায় হতো, এখন সেটাই ৮০০-১০০০ টাকা লাগে। ধান কাটার সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয় বা মেশিন আনতে হয়।”

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকায়। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে গড়ে ২১ থেকে ২২ মণ ধান উৎপাদন হলেও প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১১২০ টাকা। ফলে বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে থাকায় কৃষকের হাতে লাভ থাকছে না। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হয়ে ১৩৫০ টাকায় বিক্রি করা যেত, এখন সেই হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে।

কৃষক রফিকুল ইসলামের ভাষায়,“ধান ভালো হইলেও লাভ থাকে না। খরচ বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়ে না। শেষ পর্যন্ত খড়টাই শুধু লাভ হিসেবে থাকে।”

ধান চাষ বন্ধ করাও কৃষকের পক্ষে সহজ নয়। কারণ ধান শুধু বিক্রির পণ্য নয়, অনেক পরিবারের সারা বছরের খাবারের নিশ্চয়তা। কৃষকেরা বলছেন, বাজারে ধান বিক্রি করে লাভ না থাকলেও ঘরের ভাতের জন্য ধান লাগবেই। তাই লোকসানের হিসাব জেনেও তাঁরা ধান চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ধান সংরক্ষণের সুযোগ না থাকাও ছোট কৃষকদের বড় সমস্যা। অধিকাংশ কৃষক ধান কাটার পরপরই তা বিক্রি করতে বাধ্য হন। কারণ তাঁদের ঋণ শোধ করতে হয়, শ্রমিকের টাকা দিতে হয়, সংসার চালাতে হয় এবং পরবর্তী চাষের প্রস্তুতিও নিতে হয়। ফলে বাজারে যখন সরবরাহ বেশি থাকে এবং দাম কমে যায়, ঠিক সেই সময়েই তাঁরা ধান বিক্রি করেন।

কৃষক রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, “যাদের টাকা আছে, তারা ধান ধরে রাখতে পারে, পরে ভালো দামে বিক্রি করে। কিন্তু গরিব কৃষকের সেই সুযোগ নাই। আমাদের তো ধান কাটার পরই বিক্রি করতে হয়।”

গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক আল মামুনের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে ২১ মণ ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে সংসারের প্রয়োজন ও দেনা পরিশোধের চাপে ১২ মণ ধান ১১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এতে কোনোভাবে খরচের টাকা উঠলেও লাভ বলতে কিছু থাকেনি।

কৃষক আল মামুন বলেন, “বাড়িতে দুইটা গরু আছে। তাই জমির খড়গুলোই আমার লাভ। আমরা ধান চাষ বন্ধ করতে পারি না। ঘরের খাবারের জন্য ধান লাগবেই। কিন্তু বাজারে বিক্রি করে লাভ হয় না। ছোট কৃষক আর বর্গাচাষিরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে আছে।”

কৃষকদের মতে, ধানের পাশাপাশি খড় এখন আলাদা অর্থনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। যাঁদের গরু-ছাগল আছে, তাঁরা খড় ব্যবহার করতে পারেন। আবার কেউ কেউ খড় বিক্রি করেও সামান্য টাকা পান। কিন্তু সেটি মূল ফসলের লোকসান পুষিয়ে দেওয়ার মতো নয়। তারপরও কৃষকেরা বলছেন, ধান বিক্রিতে লাভ না থাকলে অন্তত খড় কিছুটা সহায়তা করে।

রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ফলন মোটামুটি ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। বিশেষ করে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। অনেক বর্গাচাষি জমির মালিককে ভাগ বা ভাড়া দেওয়ার পর নিজের জন্য সামান্য ধানও রাখতে পারছেন না।

পবা উপজেলার কৃষক সাইদুর রহমান বলেন,“ধানের মাঠ দেখে সবাই ভাবে কৃষক লাভে আছে। কিন্তু খরচের হিসাব কেউ দেখে না। জমিতে ফসল আছে, কিন্তু কৃষকের হাতে টাকা নাই।”

চলতি মৌসুমে মাঠে ধানের শীষ পেকেছে, কৃষকের ঘরেও উঠছে নতুন ধান। কিন্তু সেই ধানের সঙ্গে ঘরে ঢুকছে ঋণের চাপ, বাজারদরের হতাশা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। ধান কাটার আনন্দ তাই অনেক কৃষকের কাছে পরিণত হয়েছে হিসাব মেলানোর দুশ্চিন্তায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের দিক থেকে বড় কোনো ঘাটতি না থাকলেও কৃষকের আর্থিক সংকট ক্রমেই বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. সাবিনা বেগম বলেন,“কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, উন্নত বীজ এবং যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ করলে লাভের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।”

এদিকে জেলা সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, বাজারে কৃষিপণ্যসহ যেকোন পণ্যের দাম মূলত সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বোরো মৌসুমে একসঙ্গে বেশি ধান বাজারে আসায় মৌসুমের প্রথম দিকে দাম কিছুটা কম থাকে। এ কারণে কৃষকদের ধান গুদাম অথবা ব্যক্তি পর্যায়ের সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা মৌসুম পরবর্তী সময়ে যখন ধানের মূল্য বৃদ্ধি পাবে সেসময় ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহী জেলায় প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কৃষকদের তালিকা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সরকারি দরে ধান এবং চাল সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান আছে। চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে রাজশাহী জেলায় স্থানীয় খাদ্যগুদামের মাধ্যমে ৭ হাজার ৫৪৮ মেট্রিক টন বোরো ধান সরকারি দরে ক্রয় করা হবে।

তবে কৃষকদের দাবি, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম আরও সহজ ও কৃষকবান্ধব করতে হবে। অনেক ছোট কৃষক প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, তালিকাভুক্তি বা গুদামে ধান দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পান। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, বিশেষ করে বর্গাচাষি ও ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সরাসরি সুবিধার আওতায় আনার দাবি তাঁদের।

কৃষকদের ভাষায়, শুধু ভালো ফলন হলেই কৃষকের মুখে হাসি ফোটে না। ন্যায্য দাম, কম উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণের সুবিধা এবং সহজ সরকারি সহায়তা—সব মিললেই কৃষক প্রকৃত অর্থে লাভবান হন।

এক বিঘা জমির এই গল্প তাই শুধু পাকুড়িয়ার রফিকুল ইসলাম বা গোদাগাড়ীর আল মামুনের নয়। এটি রাজশাহীর হাজারো কৃষকের বাস্তবতা। সোনালি ধানের প্রাচুর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে ঘাম, ঋণ, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার দীর্ঘ লড়াই। ধান ঘরে ওঠে ঠিকই, কিন্তু লাভের খাতা শূন্য থাকে; শেষে কৃষকের মুখে একই কথা—ধান নয়, খড়টাই এখন ভরসা।