বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির ‘সংকটাপন্ন’ ঘোষণা: মানা হচ্ছে না বিধিনিষেধ, তোলা হচ্ছে পানি
রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে গত বছরের ২৫ আগস্ট ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এ ছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গত জানুয়ারিতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। ফলে ক্রমেই সংকট আরও বাড়ছে।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা ‘মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত ২২ জানুয়ারি এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এর পর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এ এলাকাকে ‘পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খাওয়ার জন্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা আগামী দুই বছরের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘোষণার পর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গত জানুয়ারিতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। ফলে ক্রমেই সংকট আরও বাড়ছে।
পানি আইন অনুযায়ী, সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ থাকবে। নলকূপের মাধ্যমে খাওয়ার পানি সরবরাহ অব্যাহত রেখে সেচকাজের ফসল বৈচিত্র্যকরণ করে পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পানি উত্তোলন কমাতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
যেকোনো এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তরের সর্বনিম্ন নিরাপদ আহরণসীমা নির্ধারণ করতে পারবে। ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। জনগণের ব্যবহারযোগ্য খাস জলাশয় ও জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে; কোনো জলাধারের সব পানি আহরণ করা যাবে না। এ রকম ১১টি বিধিনিষেধ প্রতিপালন করা বাধ্যতামূলক। বিধিনিষেধের লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
নিয়মানুযায়ী পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে কোনো গ্রাহক খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজ করতে পারবেন না। তবে কেউ এই বিধিনিষেধ মানছেন না। আবাসিক সংযোগ নিয়ে অনেকেই সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছেন। পল্লী বিদ্যুৎ শুধু জরিমানা করছে।
তানোরের নারায়ণপুর মৌজার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে। সেখানে রীতিমতো আবাসিক সংযোগ থেকে ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। মাটির দেয়াল ছিদ্র করে পাইপ বাইরে বের করে কেউ কেউ জমিতে সেচ দিচ্ছেন। ডাকাডাকি করলে প্রথমে ভয়ে বাইরে বের হচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে বেরিয়ে এসে একজন বললেন, জমি পড়ে আছে, খাবেন কী। তাই জীবন বাঁচাতে এ কাজ করছেন।
কথিত চালকলের বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, ভেতরে চালকলের পরিত্যক্ত কিছু অংশ পড়ে আছে। ঘরের ভেতরে সেচের পাইপ ও অন্যান্য জিনিসপত্র। মালিক ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলামের বাড়ি তানোরের বাধাইড় ইউনিয়নের চকবাধাইড় গ্রামে। জানতে চাইলে জহুরুল বলেন, ‘তিন বছর আগে ইউএনও অফিস থেকে আমাকে এই নলকূপ বসানোর অনুমতি দিয়েছে।’
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৯৮৫-৮৬ সালে সেচকাজে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এরপর ১৯৯৩ সাল থেকে এ কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এই তিন জেলার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় সেচকাজে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে বসানো এই নলকূপগুলোর সক্ষমতা ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান। নির্দেশনা মানলে প্রতিবছর বর্ষার পর পানির স্তর আগের অবস্থায় ফিরে আসত।
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে কোনো কোনো এলাকায় মাটির নিচে পানিধারক স্তর মারা গেছে। এ স্তরে যে বালু পানি ধারণ করে, তা ধুলায় পরিণত হয়েছে। বালুর বদলে এখন সেখানে শুধু কাদা। এখন যতই বৃষ্টি হোক, সেখানে পানি জমছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, তিন জেলায় অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকায় বিএমডিএর ৩ হাজার ৭৭টি গভীর নলকূপ আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে। এ উপজেলার বিএমডিএর নলকূপ আছে ৫০২টি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নাচোলের কোথাও কোথাও ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পানির স্তর ২৯ দশমিক শূন্য ৯ মিটার থেকে ৩১ দশমিক শূন্য ৪ মিটারে নেমে গেছে। পরে তা আর পুনর্ভরণ হয়নি। অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকার পানির স্তরের একই পরিণতি হয়েছে।
অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা গোদাগাড়ীর সুন্দরপুর মৌজা। এখানে বিএমডিএর গভীর নলকূপের কাছে গিয়ে দেখা গেল, ৪ ইঞ্চি পাইপে চার ভাগের এক ভাগ পানি উঠছে। কখনো কখনো আরও কম উঠছে। নলকূপের অপারেটর সাত্তার আলী বললেন, ‘তিন বছর থেকে এই ডিপে (নলকূপে) পানি উঠছে, আবার বন্ধ হয়ে যাইচ্ছে। কোনো গ্যারান্টি নাই। এখন রিস্কের ওপর চালাইতে হচ্ছে। এই ডিপে ৪০ থেকে ৫০ বিঘা জমিতে বোরো ধান করা হয়েছে। এখন খাইতে হইবে প্যাটে, বুঝতেই তো পাইরছেন। লিয়ার (পানির স্তর) নিচে নাইমে যাচ্ছে দিন দিন। আল্লাহ তুইলছে বুইল্যা তুলাচ্ছি। দু-পাঁচ বছরের মধ্যে যত ডিপ টিউবওয়েল আছে, সব নষ্ট হয়ে যাবে।’
সুন্দরপুর গ্রামের কিষানি সাহানারা বেগম (৪৫) এই নলকূপের আওতায় বোরো চাষ করেছেন। তিনি তাঁর ধানখেত দেখাতে নিয়ে গেলেন। দেখা গেল, মাটি ফাটতে শুরু করেছে। এখন সেচ না দিলে মাটি শুকিয়ে যাবে। সাহানারা বেগম বললেন, ‘এক বিঘা জমি ভেজাতে চার ঘণ্টা সময় লাগবে। এক বিঘা বোরো চাষ করতে ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত শুধু পানির পেছনে খরচ হচ্ছে।’
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, সরকারের নির্দেশনা ছিল সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ নলকূপ বসানোর। এর মধ্যে বিএমডিএর ৮ হাজার ৪০০। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলে চলছে ২৮ হাজার। বিএমডিএ পানি তোলে মাত্র ২৭ শতাংশ। বাকি পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প তুলছে। এগুলো কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না।
আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ এখন সেচকাজে ২২ শতাংশ ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করছে। ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ৫০ শতাংশ হবে। এ জন্য ৫৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ প্রকল্প থেকে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া আরও দুটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। তিনি বলেন, বরেন্দ্র এলাকায় ৫ হাজার ৫৫৩টি খাসপুকুর ও জলাশয় আছে। এগুলো উপজেলা প্রশাসন ইজারা দিচ্ছে। বিএমডিএকে দিলে তারা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে।
পুকুরের ব্যাপারে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, সব খাসপুকুর ইজারা দেওয়া হয়নি। কিছু কিছু জলাধার হিসেবে ব্যবহারের জন্য পুনঃ খনন করা হচ্ছে। সবগুলো উন্মুক্ত করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় দরকার।