শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

পাখি ও পাথরের দেশ

আরিফুল হাসান ১৪ মে ২০২৬ ১১:২৯ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
আরিফুল হাসান ১৪ মে ২০২৬ ১১:২৯ অপরাহ্ন
পাখি ও পাথরের দেশ

সে সন্ধ্যাটা শেষ না হতেই পাখিদের স্মরণসভা শুরু হয়। জঙ্গলের ছোটবড় প্রাণীরা আসে। বাঘ-ভালুক আসে, নেকড়ে ও হায়েনারা আসে, অশ্রুভেজা হয়ে কুমিরেরা আসে। পাতার ফাঁকজুড়ে অন্ধকারগুলো আরও ঘনীভূত হয়। ঝিঁঝিট তার শোকের সঙ্গীতের কোরাসে শোক প্রকাশের প্রস্তাবনা করলে নেমে আসে নৈঃশব্দ নীরবতা। বাঘ দাঁড়ায়, তার নরম থাবায় লুকিয়ে থাকে নখÑআওয়াজ হয় না। সিংহ একটা দাঁড়ায়, মরা-ত্যাড়া, গর্জন নেইÑতাই আওয়াজ হয় না।


নেকড়েগুলো চোরের মতো দাঁড়ায়Ñতাই আওয়াজ হয় না। হায়েনারা অন্ধকারের সহচর, তাই আওয়াজ হয় না। সবাই এক মিনিট নীরবতা পালন করে। ‘সব পাখি মারা গেছে,’ বলে বাঘ, ‘আমাদের মুক্তির জন্য’। আমরা তাদের জন্য কী করেছি? মানুষের মুখোমুখি যুদ্ধে তারা আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করেছে আর রকেট লাঞ্চারে ঝরে পড়েছে অবিরল বৃষ্টির মতোÑযার ফোঁটাগুলো লাল। জলের পরিবর্তে আকাশ থেকে ঝরছিলো রং আর পাখিদের পায়ে পাথর বওয়া ক্লান্তি যেন জমানো মেঘ ছিলো। পাখিরা তাদের ছাড়েনি। অবিরাম বৃষ্টিধারায় পাথর বর্ষণের দাপটে একটি জনপদকে ঢেকে দিয়েছে। মানুষেরা পরাজয় মানলে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক পৃথিবী ফিরে


পেয়েছি অথচ পাখিদের প্রতি আমাদের দায় কী? দায়িত্ব কী? কী দায়িত্ব আমরা পালন করেছি তাদের প্রতি?


‘তারা যখন সুদূর পর্বতের দেশ থেকে বয়ে আনছিলো পাথর, তাদের ডানায় রোদ কেটে, মেঘ ভেঙে জখম হয়ে যাওয়ার চিহ্নদুঃখ আমরা কি বুকে মাখতে পেরেছি? তারা যখন মরুভূমির উপর দিয়ে উড়ে আসছিলো আমরা কি দেখেছি উত্তাপ কীভাবে মরীচিকা হয়ে তাদেরকে বিভ্রান্ত করছিল, তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিচ্ছিল তাদের কীভাবে? আমরা দেখিনি। না দেখেছি তাদের পাথর ভাঙার দুর্ধষ শ্রম, অথবা যখন সুমেরীয় তিনটি পর্বতের গলিত লাভা তাদের পিছু ধাওয়া করেছিল তখন তারা কী কৌশলে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে এনেছিল তা আমরা দেখিনি। আমরা দেখিনি কতগুলো পালক পুড়েছে তাদের। সেই দীর্ঘ ক্লান্তির, শ্রমের, ত্যাগের ও আত্মত্যাগের কথা কি আমরা ভুলে গেছি?


‘আমরা ভুলতে চাই না, তবু আমাদের বিনাস্মৃতির পাহাড় ঠেলে দেখি যদি, সে পাহাড়ে কি লক্ষকোটি পাখিদের পালকপোড়া ঘ্রাণ মেখে নেই? আছে। বিস্মৃতির পাহাড়ে আছে। কিন্তু স্মৃতির পাহাড়ে কী? শূন্য। শুধু শূন্য।


‘এই শূন্যস্থান আমরা কী দিয়ে পূরণ করবো? পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হতো যে সকাল, যে সন্ধ্যা Ñসেসব এমন সুরহীন মৃত হবে, ঝিঁঝিট সন্ধ্যায় শুনতে হবে আলবাটধস পাখির শোকগীতির বিকল্পÑএসব আমরা ভাববো কীভাবে? প্রহরে প্রহরে আর জিকির উঠবে না নিশির, তা কি হয়? তা হবে কেনো? সেসব হতে দেয়া যায় না। সে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের প্রাণীরই এসব মেনে নিতে কষ্ট হবে। আমরাও কষ্ট পাবো। তবে একসময় মানিয়েও যাবো।


‘আমরা পাখিদের কথা ভুলে গেলে চলবে নাÑতারা আমাদের ভাই ছিলো, বোন ছিল। আমাদের স্বজন ছিলো প্রতিবেশী ছিল। আমরা নিজেদের স্বার্থে বেঁচে রয়েছি আর ওরা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে। একটা পাখিও অবশিষ্ট নেই। সব...সব শেষ।


‘আমরা আমাদের মৃত পাখি বন্ধুদের জন্য কী করতে পারি তা নিয়ে আমাদেরকে ভাবতে হবে। কী করা যায়? তাদের নামে যদি আকাশটার নামকরণ করে দেই, কিংবা একটি গ্রহের, এই ধরা যাক মাতৃগ্রহ পৃথিবীটাইকে যদি পাখি নামে ডাকি, তাদের ঋণ কি শোধ হবে? কিংবা একটি মাসের নাম, নিদেনপক্ষে দিনের নামও রাখা যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না আমরা? এতে কি ঋণ পরিশোধ হবে? দায় শেষ হবে? অথবা যদি জঙ্গলের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ নদীটির নাম রাখি পাখি নদী, কিংবা যদি দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ঝর্ণাটির, প্রপাতটির নাম দেই পাখিদের নামেÑঋণ শোধ হবে? হবে না।


‘কারণ তাদের বুকের ভেতর থেকে বয়ে গেছে সবচেয়ে উত্তম প্রস্রবণ, তাদের বুকের ভেতর যে নদী, অথবা অবারিত যে আকাশ তারা ধরেছিল বুকের ভেতর, সেসবের কোনো তুলনা হয় না। জগতে এমন কিছু নেই সেই আত্মত্যাগের শামিল। আমরা বুঝলাম না, নিজেদেরকে আড়াল করলাম সবুজের আঁধারে। আর পাখিরা আকাশকে আপন করে নিলো, আলোককে আপন করে নিলো, অনিবার্য যুদ্ধ শেষে যখন আমাদের এখানেও আলো পৌঁছলোÑতারা নিশ্চিহ্নতা বরণ করে নিলো। ‘পাখিদের সমকক্ষ আমরা কেউ না। তাদের নখরে দেখেছি শিলার পাহাড় টুকরো টুকরো হতে, তাদের ডানায় দেখেছি বিদ্যুৎ আর তাদের চোখে ছিল স্বাধীনতা।


স্বাধীনতার স্বাদ আমরা বুঝি, এখন বুঝি...এই মুক্তঅরণে ̈ নিজেদের রাজ্যপাট মেলে দিয়ে ভালোই তো আমরা স্বাধীনতার ফলভোগ করছি, কিন্তু পাখিরা আজকে কোথায়! কোথায় তাদের সেই ডানার পতপত?’ এটুকু বলে বাঘ আর কোনো কথা বলতে পারলো না। একটা পাথরের ওপর বসে গেলো নিজেও পাথর হয়ে। তারপর তার চোখদুটো দিয়ে সমানতালে অশ্রুবর্ষণ শুরু হলো। এমন অশ্রুবর্ষণ, যেনো সেখানে একটা নদী বয়ে গেছে।


তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় নেকড়ে, অজগর। তারা তাদের করুণ সুরের বিলাপ করে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদে। জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়। যুদ্ধে পাখিদের একচ্ছত্র অবদানের কথা বলে। তাদের জন্য করণীয় কী সে প্রশ্ন তারাও রাখে। কিন্তু কোনো উত্তর বাতলাতে পারে না নিজেদের প্রশ্নের। সবশেষে বলে, ‘তাহলে কি কিছুই করার নেই আমাদের?’ তারপর দাঁড়ায় ভল্লুক, সজারু, গিরগিটি, বানর, খরগোশ, গুইসাপ আরও অনেকে। সবাই যার যার   স্মৃতিচারণে পাখিদের শৌর্য বর্ণনা আর শোক-সন্তাপ করে। উঠে দাঁড়ায় হায়েনা। চাঁদের দিকে চেয়ে মুখব্যাদান করে। রাতের অন্ধকার চিরে করুণ সুরে ডেকে ওঠে। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে আকাশ। হায়েনা বলতে শুরু করে, ‘আমাদের একটা আকাশ ছিল, সে আকাশে একদিন পাখিরা উড়তো। আজ থেকে আমাদের আকাশ অন্ধ হয়ে গেছে। আমরা আর আলো দেখবো না, দেখবো না রঙিন ডানায় পতপত শব্দ তোলে উড়ে যাওয়া পাখি। স্তদ্ধ আকাশের দিকে চেয়ে এখন আমরা কী করবো?


‘যখন মানুষেরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো সবুজের বিরুদ্ধে, যখন উজাড় হচ্ছিল বন, জঙ্গলের প্রাণীগুলো দিগি¦দিক ছুটাছুটি করছিল, যখন আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল আমাদের আবাস্থলÑযখন আমরা গুহায় লুকালাম, কিংবা নিজেদেরকে বাঁচাতে কালেভোদড়ও দিনের বেলায় বের হওয়া থেকে বিরত থাকলাম, আমরা একরকম নিশাচর প্রাণী হয়ে উঠছিলাম সবাই তবু আমাদের শেষরক্ষা হচ্ছিল


না, আমরা দিনের পর দিন কমতে থাকলাম, শিকার হতে থাকলাম মানুষের হাতে, আগুনে পুড়ে মারা যেতে থাকলাম মধ্যরাতে, আমাদের হাতে আর বাঁচার উপায় ছিল না যখন, যখন সব পথ রুদ্ধ হয়ে উঠেছিলÑতখন পাখিরা বিদেধাহী হয়ে উঠে। ‘মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা এনে দেয় আমাদের মুক্তি। ...এবং তারা নিঃশেষ হয়ে যায়। একটি পাখিও আর বেঁচে নেই।


‘আমরা তাদের জন্য কী করতে পারি?’ এমন সময় কোথা থেকে যেনো উড়ে এলো একটি পাখি। যার পালকে ছিলো বারুদের দাগ, আর ডানায় ছিলো রক্তজবার মতো ক্ষত। এই পাখিটা ছিলো সবপাখি। কারণ স্মরণ সভায় আগত প্রত্যেকেই পাখিটাকে তাদের প্রিয়-পরিচিত পাখিটির আদলে দেখলো। পাখিটি কোনো কথা বললো না। ভাষা নেই অন্য কারো মুখে। আবার সেই বরফ নীরবতা। এবার উঠে দাঁড়ালো সিংহ। সভা শেষ হবে, সবাই বুঝতে পারছে। কিন্তু এই পাখিটির কী হবে তা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। আকাক্সিক্ষত অথচ বিলুপ্ত, একা...


সিংহ বলতে শুরু করেÑসভাপতির সমাপনী ভাষণ, ‘বন্যকূল, ধন্যবাদ সবাইকে। পাখি প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে আমাদেরকে মুক্তি দিতে। তাদের জন্য আমাদের কী করণীয় তা ছিল আজকের স্মরণ সভার মূল সমস্যা। আমি বনের রাজা, এর একটা সমাধান আমি বের করেছি’ তারপর নিশ্চিহ্নতার ভেতর থেকে স্বপ্নের মতো উড়ে আসা বিধ্বস্ত পাখিটিকে দেখিয়ে বলে, ‘পাখিটিকে নিশ্চয়ই তোমরা চিনেছো। এ আমাদের প্রত্যেকের প্রিয়। আর প্রিয় জিনিসই উৎসর্গ করতে হয়। চলো, আমরা একে উৎসর্গ করি সকল পাখির উদ্দেশে।