শনিবার, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬

নদীর নীল চিঠি । তন্ময় নিসার

সোনার দেশ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:২৪ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
সোনার দেশ ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০১:২৪ অপরাহ্ন
নদীর নীল চিঠি । তন্ময় নিসার

নদীর ধারে ছোট্ট গ্রামটা ভোরবেলায় সবচেয়ে সুন্দর দেখায়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্য উঠলে মনে হয়, আলো আর জলের মাঝে কেউ গোপনে হাসছে। সেই গ্রামের মেয়ে নীলা। বয়স কম কিন্তু চোখে তার এক অদ্ভুত স্থিরতা যেন সে আগেই অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে, আবার অনেক কিছু এখনো শেখেনি। নীলার বাবা নদীতে নৌকা চালাতেন, মাঝি। এক বর্ষায় নৌকা উল্টে গিয়ে তিনি আর ফেরেননি। মা সেলাই করে সংসার চালান। নীলার পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে মায়ের হাত কাঁপে, তবু মুখে অভিযোগ নেই। নীলা জানে, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে। সে প্রতিদিন বিকেলে নদীর ধারে বসে বইখাতা খুলে পড়ে। নদী তার বন্ধু, বাতাস তার শ্রোতা। সেদিনই প্রথম সে আরিফকে দেখে। আরিফ শহর থেকে এসেছে। বয়সে যুবক -চোখে ক্লান্তি, কাঁধে ব্যাগ। সে গ্রামে এসেছে নদী নিয়ে গবেষণার কাজে। এ গ্রামের স্কুলে সে অস্থায়ীভাবে পড়াতেও রাজি হয়েছে। প্রথম দিন স্কুলে ঢুকে সে দেখে, পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটি মন দিয়ে শুনছে, চোখে প্রশ্নের ঝিলিক। ক্লাস শেষে আরিফ নীলাকে ডাকে। -‘তুমি নিয়মিত  নদীকে পড়ো?’ নীলা মাথা নাড়ায়। ‘হ্যাঁ স্যার। নদীটা বুঝতে চাই।’ আরিফ হাসে। সে বুঝতে পারে, এই মেয়ের কৌতূহল সাধারণ নয়। সেই দিন থেকে আরিফ তার পড়াশোনায় সাহায্য করতে থাকে। কখনো গণিত, কখনো ভূগোল, কখনো নদীর গল্প। সম্পর্কটা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর, বড়ভাইয়ের মতো। আরিফ খুব সচেতন -একটা সীমারেখা আছে, সেটাই সুরক্ষা।


গ্রামের মানুষজন বলে, ‘শহরের ছেলে, বেশি দিন থাকবে না।’ আরিফও জানে, তার কাজ শেষ হলে তাকে চলে যেতে হবে। তবু বিকেলের পড়ার সময়টা সে মিস করে না। নীলার চোখে সে ভবিষ্যৎ দেখে-একটা সম্ভাবনা।


সময় গড়ায়। নীলা স্কুলের সেরা ফল করে। বৃত্তি পায়। বিদায়ের দিন আরিফ নদীর ধারে নীলার হাতে একটা নীল খাম দেয়। -‘খুলো না এখন। যখন নিজেকে শক্ত মনে হবে, তখন খুলবে।’ আরিফ চলে যায়। নদী আগের মতোই বয়ে চলে, কিন্তু নীলার ভেতরে কিছু একটা বদলে যায়। সময় এগোয়।


চার বছর পর

নীলা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। শহরের কোলাহলে সে নিজের জায়গা বানিয়েছে। একদিন পরীক্ষার চাপ আর ক্লান্তিতে খামটা খোলে। ভেতরে একটি চিঠি-‘নীলা, তুমি যখন এটা পড়ছো, তখন তুমি নিজের পথ বেছে নেওয়ার বয়সে। মনে রেখো, তোমার প্রশ্নগুলোই তোমার শক্তি। নদী যেমন পথ খুঁজে নেয়, তুমিও নেবে।-আরিফ’


নীলার চোখ ভিজে যায়। চিঠিটা কোনো প্রেমের স্বীকারোক্তি নয়, কিন্তু গভীর এক বিশ্বাসের দলিল। আরও দুই বছর পরে, এক সেমিনারে নীলার সঙ্গে আরিফের দেখা হয়। দু’জনই এখন প্রাপ্তবয়স্ক, সমান উচ্চতায় দাঁড়িয়ে। আরিফ বিস্মিত হয়ে দেখে, সেই কিশোরী এখন আত্মবিশ্বাসী নারী। নীলা দেখে, যুবকটি এখনো একই রকম শান্ত। কথা শুরু হয় নদী দিয়ে, শেষ হয় জীবন নিয়ে। -‘তুমি কেমন আছো?’ আরিফ জিজ্ঞেস করে। -‘নিজেকে খুঁজে পেয়েছি,’ নীলা বলে। এবার সম্পর্কের রং আলাদা। কোনো তাড়া নেই, কোনো অসামঞ্জস্য নেই। দু’জনেই জানে, অনুভূতিটা ধীরে গড়ে উঠেছে -সম্মান আর সময়ের ভেতর দিয়ে। তারা নদীর ধারে হাঁটে। সূর্য ডোবে। নীলা বলে, -‘আপনি তখন সীমা টেনেছিলেন। তার জন্যই আজ আমি নিরাপদ ছিলাম।’ আরিফ মাথা নোয়ায়। -‘ভালোবাসা মানে রক্ষা করা।’ এইবার ভালোবাসা আসে নীরবে। কোনো নাটক নেই, কোনো অতীতের বোঝা নেই। শুধু দু’জন মানুষ-নিজ নিজ পথে তৈরি হয়ে এসে এক জায়গায় দাঁড়ানো। নদী বয়ে চলে। নীলার খাতায় নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আরিফ জানে, এই প্রেম নিটোল  -কারণ এর ভিত তৈরি হয়েছে সময়, সম্মান আর সঠিক মুহূর্তে।


ফিরে দেখা

নদীর নাম নীলা ছিল। নদীর নাম কেউ জানত না। গ্রামের মানুষ তাকে শুধু বলত -নদী। কিন্তু নীলার কাছে নদীর একটা নাম ছিল, একটা নিঃশব্দ ডাক ছিল, যা সে কাউকে বলেনি কখনো। নদীর ঢেউয়ে সে নিজের শ্বাস শুনত, আর স্রোতের ভেতর খুঁজে নিত ভবিষ্যতের অস্পষ্ট মুখ। নীলা তখন ষোড়শী। বয়সটা এমন -যখন মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে, কিন্তু উত্তরগুলো এখনো সম্পূর্ণ হয় না। তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক গভীরতা, যেন সে অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পারে, আবার খুব কাছের জিনিসও তাকে কাঁদিয়ে দেয়। নীলার বাবা একদিন এই নদীতেই হারিয়ে গিয়েছিলেন। বর্ষার রাতে নৌকাটা ফিরেনি। সেদিন থেকে নদী তার কাছে ভয় আর আশ্রয়ের মাঝামাঝি একটা কিছু। বাবার স্মৃতি, মায়ের নীরব কান্না, আর নিজের বেড়ে ওঠা -সবকিছু নদীর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। মা সেলাই করতেন। রাত জেগে, চোখ লাল করে। নীলা দেখত, কিছু বলত না। সে জানত, শব্দ অনেক সময় বোঝা হয়ে যায়। তাই সে বই পড়ত। বইয়ের ভেতর সে এমন সব জগৎ খুঁজে পেত, যেখানে দুঃখও সুন্দর ভাষায় বলা যায়।


প্রতিদিন বিকেলে সে নদীর ধারে বসত। খাতা খুলে পড়ত। নদী তার শ্রোতা, বাতাস তার সঙ্গী। সেদিন আকাশটা ছিল অদ্ভুতভাবে নীল। সেই দিনই আরিফ এল। আরিফ শহরের মানুষ। বয়সে যুবক। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির নিচে ছিল এক ধরনের শান্ত দৃঢ়তা। সে নদী নিয়ে গবেষণা করতে এসেছে -জল, মানুষ আর স্মৃতির সম্পর্ক খুঁজতে। গ্রামের স্কুলে অস্থায়ীভাবে পড়ানোও শুরু করেছে। প্রথম দিন ক্লাসে ঢুকে সে দেখেছিল, পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েটি অন্যদের মতো নয়। সে প্রশ্ন করে চোখ দিয়ে। চুপচাপ, কিন্তু গভীর। ক্লাস শেষে আরিফ তাকে ডাকল। ‘তুমি প্রতিদিন এমন মন দিয়ে কি পড়ো?’


নীলা মাথা নাড়ে। -‘হ্যাঁ নদী পড়ি। কারণ না বুঝলে নদী ভয়ংকর।’  


আরিফ থমকে গেল। এমন উত্তর সে আশা করেনি। সেই দিন থেকেই আরিফ নীলার পড়াশোনায় সাহায্য করতে শুরু করল। কখনো গণিত, কখনো বিজ্ঞান, কখনো নদীর গল্প। সম্পর্কটা স্পষ্ট -শিক্ষক আর শিক্ষার্থী। কোথাও কোনো অস্পষ্টতা নেই। নীলা আরিফকে শ্রদ্ধা করত। সে তার মধ্যে কোনো রোমান্টিক কল্পনা খুঁজত না। বরং সে খুঁজে পেত দিকনির্দেশনা যেমন কেউ অন্ধকারে আলোর-বাতি জ¦ালিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষ ফিসফিস করত। ‘শহরের ছেলে, বেশিদিন থাকবে না।’ আরিফও তা জানত।


নীলা পরীক্ষায় ভালো করল। বৃত্তি পেল। বিদায়ের দিন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আরিফ, নীলা চেয়ে চেয়ে দেখলো।


আরিফ চলে গেল। গ্রাম আগের মতোই রইল। কিন্তু নীলার ভেতরে একটা দীর্ঘ শূন্যতা জন্ম নিল -যা দুঃখ নয়, আবার আনন্দও নয়।


সময়

সময় মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য শিক্ষক। সে কাউকে ছাড় দেয় না, আবার কাউকে ঠকায়ও না। চার বছর কেটে গেল। নীলা এখন শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তার পৃথিবী বড় হয়েছে। মানুষ বদলেছে। দুঃখের রং বদলেছে। কিন্তু নদীর স্মৃতি বদলায়নি। একদিন গভীর রাতে, ক্লান্ত হাতে সে নীল খামটা খুলল। সেই চিঠিটা পড়লো-


“নীলা, তুমি যখন এই চিঠি পড়ছো, তখন তুমি নিজের পথ বেছে নেওয়ার বয়সে। মনে রেখো, প্রশ্ন করা কখনো দুর্বলতা নয়। নদী যেমন বারবার বাঁক নেয়, তুমিও নেবে। ভয় পেয়ো না।’  চিঠিটা পড়ে নীলা কাঁদেনি।


কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও একটা আলো জ্বলে উঠেছিল। আরও সময় আরও দুই বছর।


এক সেমিনারে, ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে চোখ পড়ল। আরিফ। সে অবাক হয়ে দেখল - সেই কিশোরী আর নেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন পূর্ণ মানুষ। আত্মবিশ্বাসী, স্থির। নীলা দেখল -আরিফের চুলে সামান্য পাক ধরেছে। কিন্তু চোখ একই। তারা কথা বলল। নদী নিয়ে। জীবন নিয়ে। এইবার কোনো অসমতা নেই। কোনো বয়সের দেয়াল নেই। দু’জনই প্রাপ্তবয়স্ক, নিজ নিজ দায়িত্বে দাঁড়িয়ে। -‘তুমি কেমন আছো?’ -‘নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।’ তারা নদীর ধারে হাঁটল। সূর্য ডুবল। আলো নরম হলো। নীলা বলল, -‘আপনি তখন সীমা টেনেছিলেন। তাই আজ আমি নিজের মতো করে দাঁড়াতে পেরেছি।’ আরিফ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, -‘ভালোবাসা মানে দখল নয়। ভালোবাসা মানে অপেক্ষা।’ এইবার চুপচাপ। শব্দ ছাড়াই। এটা কোনো হঠাৎ আগুন নয়। এটা ধীরে জ্বলা প্রদীপ। নদী বয়ে চলল। নীলা বুঝল নদী নিজের ভের্তই বয়ে চলা এক স্রোত।