শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

সত্য প্রাপ্তির ইদ

শামীমা নাইস ০৪ জুন ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
শামীমা নাইস ০৪ জুন ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ন
সত্য প্রাপ্তির ইদ

ইদের চাঁদ আকাশে উঠলে পৃথিবীটা যেন একটু বদলে যায়। বাতাসে ভেসে আসে অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস, মানুষের মুখে ফুটে ওঠে অকারণ হাসি। শিশুরা নতুন জামার স্বপ্নে ঘুমায়, বড়রা ব্যস্ত হয়ে ওঠে উৎসবের প্রস্তুতিতে। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারে-সব ইদ একরকম নয়। কিছু ইদ শুধু উৎসব নয়, হয়ে ওঠে শিক্ষা; কোন কোন ইদ কেবল আনন্দ নয়, হয়ে ওঠে হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকা এক আলো।


আমার জীবনের তেমনই এক ইদের স্মৃতি আজও অমলিন হয়ে আছে।


তখন আমি কৈশোরের দিনগুলো পার করছি। ইদ মানেই ছিল অগাধ আনন্দ। রমজানের শেষ কয়েকটা দিন যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় কাটত। সন্ধ্যা হলেই ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম-চাঁদ উঠেছে কি না দেখার জন্য। যখন সত্যিই আকাশে সেই সরু রুপালি চাঁদ দেখা যেত, তখন মনে হতো পৃথিবী যেন হঠাৎ করে উৎসবের আলোয় ভরে উঠেছে।


আমাদের পরিবারে ইদের আগে একটি ছোট্ট রীতি ছিল। বাবা-মা আমাদের হাতে কিছু টাকা দিতেন-আমরা যাকে বলতাম “ইদের বাজেট”। সেই টাকাটা ছিল আমাদের ছোট্ট স্বাধীনতা। নতুন জামা কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, আইসক্রিম খাওয়া-সবকিছুর পরিকল্পনা তখন সেই টাকাকে ঘিরেই।


সেই বছরও বাবা-মা আমাকে ইদের জন্য কিছু টাকা দিয়েছিলেন। টাকাটা হাতে পেয়ে মনে হয়েছিল-এই ইদটা নিশ্চয়ই খুব আনন্দে কাটবে।


কিন্তু জীবন কখনও কখনও এমনভাবে মোড় নেয়, যেটা আমরা আগে থেকে ভাবতেও পারি না।


ইদের কয়েকদিন আগে আমরা কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে বসে গল্প করছিলাম। চারদিকে তখন ইদের বাজারের রঙিন কোলাহল। দোকানে ঝুলছে নতুন নতুন জামা, ছোটদের পাঞ্জাবি, ফ্রক আর স্যান্ডেল। মানুষের ভিড়, আলো আর হাসিতে পুরো বাজার যেন উৎসবের এক চলমান চিত্র।

আমরা নিজেদের ইদের পরিকল্পনা নিয়েই আলোচনা করছিলাম।

হঠাৎ আমাদের এক বন্ধু একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

“তোমরা কি খেয়াল করেছো, আমাদের পাড়ার পাশের বস্তিতে অনেক শিশু আছে যাদের ইদে নতুন জামা হয় না?”

কথাটা শুনে আমরা কিছুক্ষণ নীরব হয়ে গেলাম। বিষয়টা আমাদের অজানা ছিল না। কিন্তু আমরা কখনো গভীরভাবে ভাবিনি।

আমাদের আরেকজন বন্ধু ধীরে বলল,

“আমরা যদি নিজেদের ইদের বাজেটের কিছু টাকা একসঙ্গে করি, তাহলে কি কয়েকটা শিশুর জন্য নতুন জামা কিনে দেওয়া যায় না?”

প্রস্তাবটা ছিল খুবই সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণ কথার ভেতর যেন এক অদ্ভুত মানবিক আলো ছিল।

আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল-এটা কি সত্যিই করা সম্ভব?

শেষ পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম-আমাদের ইদের বাজেট আমরা একসাথে করব। কেউ একটু বেশি দিল, কেউ একটু কম। কিন্তু প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে এল।

ছোট ছোট টাকাগুলো একসঙ্গে করে যখন গুনলাম, তখন বুঝলাম-এতে বেশ কয়েকজন শিশুর জন্য নতুন পোশাক কেনা সম্ভব।

তারপর আমরা সবাই মিলে বাজারে গেলাম।

ইদের বাজার তখন রঙ, আলো আর মানুষের ভিড়ে প্রাণবন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আমরা দোকানে দোকানে ঘুরে ছোটদের জন্য সুন্দর কিছু পোশাক বেছে নিতে লাগলাম। ছোট পাঞ্জাবি, রঙিন ফ্রক, আর স্যান্ডেল-সবকিছু এমন যত্ন করে নির্বাচন করছিলাম যেন সেগুলো আমাদের নিজেদের জন্যই।

আসলে সত্যি বলতে, নিজের জন্য কিছু কেনার চেয়েও তখন বেশি আনন্দ হচ্ছিল।

পরদিন আমরা সেই পোশাকগুলো নিয়ে গেলাম দরিদ্র শিশুদের কাছে।

তাদের সামনে যখন নতুন জামাগুলো তুলে ধরলাম, তখন যে দৃশ্য দেখেছিলাম-সেটা আজও আমার হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

একটি ছোট ছেলে নতুন পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না—এটা সত্যিই তার জন্য। আরেকটি ছোট মেয়ে নতুন ফ্রকটা বুকে জড়িয়ে ধরেছিল এমনভাবে, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহার পেয়েছে।

তাদের চোখের সেই আনন্দ, সেই উজ্জ্বলতা—আমাদের মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিয়েছিল।

সেই মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারলাম-ইদের আনন্দ শুধু নিজের জন্য কিছু পাওয়ার মধ্যে নেই। আসল আনন্দ হলো অন্যের জীবনে সামান্য হলেও সুখের আলো পৌঁছে দেওয়া।

সেদিন ইদের নামাজ পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল-মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে। যেন হৃদয়ের গভীরে কোথাও আলো জ্বলে উঠেছে।

বাড়ি ফিরে যখন মা-বাবাকে সব বললাম, তারা খুব খুশি হলেন। বাবা মৃদু হেসে বলেছিলেন,

“তোমরা আজ ইদের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেছো।”

সময়ের স্রোতে সেই দিন অনেক দূরে সরে গেছে। জীবনের পথে অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, অনেক স্মৃতি জমেছে। তবু সেই ইদের স্মৃতিটা আজও আলাদা হয়ে আছে।

কারণ সেদিন আমরা শুধু কিছু পোশাক কিনিনি।

আমরা শিখেছিলাম-মানুষের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক অদ্ভুত শক্তি আছে।

এখনও ইদের চাঁদ ওঠলে, সেই দিনের কথা মনে পড়ে। মনে হয়-কৈশোরের সেই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে ছিল।

কারণ সেদিন আমরা বুঝেছিলাম-

ইদের সবচেয়ে বড় আনন্দ নতুন জামায় নয়,

ইদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য উৎসবের আলোয় নয়,

ইদের সবচেয়ে বড় উপহার লুকিয়ে থাকে-

অন্যের মুখে ফুটে ওঠা একটুখানি হাসির ভেতর।